টেসলা এ বছর জুড়ে তাদের রোবট ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনায় থাকলেও মূল ব্যবসা অর্থাৎ গাড়ি বিক্রি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। সংস্থার প্রধান নির্বাহী এই সময় জুড়ে নতুন এক ট্রিলিয়ন ডলারের পারিশ্রমিক প্যাকেজ অনুমোদন এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিগত দিক নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও ইউরোপ, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রে টেসলার বিক্রয় চিত্র আরও ম্লান হয়েছে।
ইউরোপে টেসলার পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। ইউরোপীয় অটোমোবাইল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের অক্টোবর মাসে টেসলার বিক্রি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে প্রায় 48.5 শতাংশ। পুরো বছরের হিসাবে ইউরোপে টেসলার বিক্রি কমেছে প্রায় 30 শতাংশ, যেখানে এই সময়ে পুরো শিল্পখাতে বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি বেড়েছে 26 শতাংশ।
বিশ্বব্যাপী টেসলার গাড়ি সরবরাহ এ বছর 7 শতাংশ কমবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে ভিজিবল আলফা। গত বছরেও সরবরাহ কমেছিল 1 শতাংশ, অথচ সে সময়ের তৃতীয় প্রান্তিকে কর ছাড়ের সুবিধা নিতে আমেরিকান ক্রেতাদের তাড়াহুড়া টেসলার ডেলিভারিতে সাময়িক উল্লম্ফন ঘটিয়েছিল।
ইউরোপে টেসলার দুর্বল পারফরম্যান্স ইঙ্গিত দিচ্ছে যে গত বছরের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া বিক্রয় অস্থিরতা এত দ্রুত কাটবে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই সময় সংস্থার প্রধান নির্বাহীর পক্ষ থেকে রাজনৈতিকভাবে উত্তেজক ব্যক্তিদের প্রশংসা ইউরোপ জুড়ে সমালোচনা ডেকে আনে এবং এর পরবর্তী প্রভাব এখনও কাটেনি। যদিও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তিনি রাজনৈতিকভাবে নিস্তব্ধ ছিলেন, তবুও ইউরোপে টেসলার অবস্থা উন্নত হয়নি।
একসময় টেসলার মডেল ওয়াই বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বিক্রিত গাড়ির তালিকার শীর্ষে ছিল, কিন্তু এখন প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলো নতুন ফিচার, হালনাগাদ প্রযুক্তি ও তুলনামূলক কম মূল্যের মডেল সামনে এনে বাজারে চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, টেসলার সীমিত মডেল লাইনআপ গ্রাহকদের কাছে আর আগের মতো আকর্ষণীয় থাকছে না।
গত বছর সংস্থার প্রধান নির্বাহী শেয়ারহোল্ডারদের জানিয়েছিলেন যে ২০২৫ সালে গাড়ি বিক্রি 20 থেকে 30 শতাংশ বাড়াতে পারবেন বলে আশা করেন। তবে চলতি বছর কোম্পানি প্রথমে বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিলেও পরবর্তী প্রান্তিকে তা প্রত্যাহার করে নেয়। অক্টোবরের ঘোষণায় জানানো হয়, উৎপাদন ক্ষমতা ও স্বয়ংক্রিয় ফিচার যোগ করার গতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবেশই এখন তাদের বিক্রয় বৃদ্ধির মূল নির্ধারক।
ইউরোপে টেসলার সংকট আরও তীব্র এ কারণে যে প্রতিযোগীরা সেখানে 30 হাজার ডলারের নিচে এক ডজনেরও বেশি বৈদ্যুতিক মডেল বাজারে এনেছে। পাশাপাশি চীনের বেশ কিছু ব্র্যান্ড আকর্ষণীয় নকশা ও বিস্তৃত মডেল বৈচিত্র্য নিয়ে ইউরোপের বাজার দখলে নামছে। এর বিপরীতে টেসলার হাতে আছে মাত্র দুটি জনপ্রিয় মডেল মডেল থ্রি এবং মডেল ওয়াই। সম্প্রতি মডেল ওয়াই এর কম দামের একটি সংস্করণ আনা হলেও বাজারে তার প্রভাব সীমিত।
ব্রিটেনে এখন 150টিরও বেশি বৈদ্যুতিক মডেল উপলব্ধ, যার অনেকগুলোই নতুন চীনা ব্র্যান্ডের। পরের বছর আরও 50টি নতুন বৈদ্যুতিক মডেল বাজারে আসবে বলে জানায় ইলেকট্রিফাইং ডটকম। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই 50টির কোনোটাই টেসলা নয়।
এদিকে চীনের বিওয়াইডি অক্টোবরে বিক্রি করেছে 17 হাজারের বেশি গাড়ি, যা টেসলার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। জার্মানির ভক্সওয়াগনও এ বছর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইউরোপে বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি 78.2 শতাংশ বাড়িয়েছে, যা টেসলার বিক্রির তিনগুণ।
চীনে টেসলার বিক্রি গত তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। অক্টোবরে বিক্রি কমেছে 35.8 শতাংশ এবং এ বছরের প্রথম দশ মাসে মোট বিক্রি কমেছে 8.4 শতাংশ। এখানে টেসলা টেক্কা পাচ্ছে নবায়নকৃত স্থানীয় ব্র্যান্ড, পাশাপাশি শাওমির মতো নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে সেপ্টেম্বর মাসে কর ছাড়ের শেষ মুহূর্তে ক্রেতাদের ভিড়ে বিক্রি বাড়লেও অক্টোবরেই তা কমে যায় 24 শতাংশ। বড় অটোমেকারগুলো বৈদ্যুতিক প্রকল্পে গতি কমাতে শুরু করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন এটি টেসলার জন্য আংশিক সুযোগ তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে কম দামের আপডেটেড মডেল থ্রি ও মডেল ওয়াই বাজারে আসায়।
তবে বহু বিশ্লেষক মনে করেন, টেসলার দরকার নতুন একটি মডেল যা মানুষের জন্য সাধারণ ব্যবহারের গাড়ি হবে। সংস্থার প্রধান নির্বাহীর নজর বর্তমানে রোবোট্যাক্সি ও মানবসদৃশ রোবট উন্নয়নে বেশি থাকায় এ ধরনের নতুন মডেলের ইঙ্গিত মিলছে না।
তবে তার নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী টেসলার বিক্রিতে বড় ধরনের উল্লম্ফন অপরিহার্য নয়। পরবর্তী দশ বছরে গড়ে বছরে 1.2 মিলিয়ন গাড়ি বিক্রি করলেই তার আর্থিক পুরস্কার উন্মুক্ত হবে, যা 2024 সালে কোম্পানির বিক্রি হওয়া সংখ্যার কাছাকাছিই।



