উচ্চশিক্ষার জন্য উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করতে গিয়ে আমরা সচরাচর বিবেচনা করি বড় বিশ্ববিদ্যালয় নাকি ছোট, শহুরে নাকি প্রান্তিক অঞ্চলে অবস্থিত, ভর্তি প্রতিযোগিতা কতটা কঠিন, কিংবা পড়ার মান কেমন। তবে এই পুরো প্রক্রিয়ায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। সেটি হলো ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীর পছন্দের সামাজিক পরিবেশ কেমন। চার বছরের আবাসিক জীবনে তারা শুধুমাত্র শ্রেণিকক্ষে সময় কাটাবে না। বইপত্রের বাইরে যে বিশাল পরিসর থাকে, সেটির মান কেমন হবে তা জানাও সমান প্রয়োজনীয়।
অতীতে সামাজিক জীবন মানেই ছিল গ্রিক সংগঠন, অর্থাৎ ভ্রাতৃসমিতি এবং নারী সংগঠন, কিংবা একটি বিশ্ববিদ্যালয় কতটা পার্টি প্রিয় সেই মূল্যায়ন। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে বিষয়টি অনেক বেশি বহুমাত্রিক। শিক্ষার্থী কোন ধরনের আয়োজন পছন্দ করে, কোন পরিবেশে স্বচ্ছন্দ অনুভব করে এবং কী ধরনের মেলামেশা চাই তা খুঁজে বের করতে এখন নানা সূত্র ধরে এগোতে হয়।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক পরিসর বলতে বোঝানো হয় ভ্রাতৃসমিতি বা সমমনা শিক্ষার্থী সংগঠন ছাড়াও বিভিন্ন অ্যাফিনিটি গ্রুপ, যেমন নির্দিষ্ট দেশের বা সংস্কৃতির শিক্ষার্থীদের সমিতি, বিভিন্ন ক্লাব যেগুলো একাডেমিক, ক্রীড়া, ধর্মীয় বা সেবামূলক উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠে। এছাড়া রয়েছে ক্যাম্পাসের আশেপাশের রেস্তোরাঁ বা কফিশপের পরিবেশ। প্রতিটি ক্ষেত্র এক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা রূপ ফুটিয়ে তোলে।
এই পরিবেশ সম্পর্কে জানার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ক্যাম্পাস ট্যুর, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদপত্র এবং সেখানে ইতিমধ্যে পড়তে থাকা শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা। ট্যুরের সময় অভিভাবক বা শিক্ষার্থীরা যে প্রশ্নগুলো করতে পারে তার মধ্যে অন্যতম হলো কোথায় তারা সাধারণত সময় কাটায়, গ্রিক সংগঠনগুলোর প্রভাব কতটা অথবা সপ্তাহান্তে সেখানে শিক্ষার্থীরা কী করে। সব ট্যুরে সামাজিক পরিবেশ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় না, তাই প্রশ্ন তুলে নিজের প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে নেওয়াই উত্তম।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদপত্র অনেক সময় সরাসরি ও স্পষ্টভাবে ক্যাম্পাসের সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরে। কখনো স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক, কখনো ভ্রাতৃসমিতির কার্যক্রম, কখনো আবার ক্যাম্পাসজুড়ে প্রচলিত অভ্যাস নিয়ে লেখা থাকে। এগুলো পাঠককে বাস্তব চিত্র সম্পর্কে ধারণা দেয়।
সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূত্র হলো বর্তমান শিক্ষার্থী। ট্যুর গাইডরা সাধারণত প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক বক্তব্য দেয়, কিন্তু নিয়মিত শিক্ষার্থীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা বলতে স্বচ্ছন্দ বোধ করে। পরিবারের পরিচিত কেউ বা একই স্কুলের সাম্প্রতিক গ্র্যাজুয়েট হলে আরও ভালো। অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা খোলামেলাভাবে জানায়। এমনকি অনলাইনে কোনও প্রতিষ্ঠান পার্টি প্রিয় কিনা সে নিয়েও প্রচুর আলোচনা পাওয়া যায়।
গ্রিক সংগঠন নিয়ে মতভেদ রয়েছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের সংগঠন কমে গেলেও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থী এদের সঙ্গে যুক্ত। একটি তালিকায় দেখা গেছে কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীদের অর্ধেকেরও বেশি গ্রিক সংগঠনের সদস্য। তবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে এসব সংগঠনের ভূমিকা ও প্রকৃতি এক নয়। কিছু সংগঠন প্রচলিত ধারা অনুসরণ করে, আবার কোথাও বইপাঠ বা সাংস্কৃতিক আলোচনাকে কেন্দ্র করে তাদের পরিচয় গড়ে ওঠে।
অন্যদিকে, শহুরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা চাইলে সহজেই আশেপাশের রেস্তোরাঁ বা সংগীতানুষ্ঠানে যেতে পারে। কেউ যদি ভিন্নস্বাদের খাবার বা বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক আয়োজন উপভোগ করতে চায়, তবে এসব সুবিধা বিবেচনার দাবি রাখে।
এছাড়া রয়েছে বিভিন্ন ক্লাব ও সংগঠন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে সাধারণত এসব সংগঠনের বিশদ তালিকা থাকে। এগুলোর পরিসর অত্যন্ত বিস্তৃত। কোথাও অপ্রাতিষ্ঠানিক ফুটবল দল, কোথাও আন্তর্জাতিক ছাত্রসমিতি, কোথাও আবার অডিশনবিহীন সংগীত দল। এগুলোতে যোগদান কঠিন কিনা সেটিও ট্যুরে জিজ্ঞেস করা যেতে পারে, কারণ কিছু প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে পেশামুখী ক্লাবগুলোতে ভিড় থাকে।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাবের প্রকৃতি অনেক সময় শিক্ষার্থীদের মানসিকতা বুঝতে সাহায্য করে। যেমন কিছু জায়গায় এমন নৃত্য ক্লাব থাকে যেখানে নাচ না জানলেও অংশ নেওয়া যায়। এটি ইঙ্গিত করে যে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা নিয়ে যতই গুরুত্ব দিক, নিজেদের খুব বেশি গম্ভীরভাবে নেয় না।
এই সব মিলিয়ে বোঝা যায় যে উচ্চশিক্ষার গন্তব্য বাছাই করতে সামাজিক পরিবেশ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যে জায়গায় শিক্ষার্থী নিজের মতো করে মানিয়ে নিতে পারবে, সেখানেই তার চার বছর হবে আরও পরিপূর্ণ।



