যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত মিয়ানমারের নাগরিকদের জন্য বহু দিন ধরে কার্যকর থাকা সাময়িক আইনি স্বীকৃতি বা টেম্পোরারি প্রটেক্টেড স্ট্যাটাস টিপিএস বাতিলের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন। প্রেসিডেন্টের প্রশাসনের এই ঘোষণা মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সোমবার ঘোষিত এই সিদ্ধান্তে প্রশাসন বলেছে যে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশটিতে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে এবং মিয়ানমারের নাগরিকেরা নিরাপদে দেশে ফিরতে পারবেন। সামরিক শাসক কর্তৃপক্ষের নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনাকে এই উন্নতির প্রমাণ হিসেবে দেখিয়েছে তারা। তবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী মিয়ানমারের বহু নাগরিক ইতিমধ্যেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কারণ দেশে ফেরার পরিবেশ নিয়ে নানা শঙ্কা রয়েছে।
২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থান এবং বেসামরিক সরকারকে সরিয়ে দেওয়ার পর থেকেই মিয়ানমার অব্যাহত রাজনৈতিক চাপ, সংঘাত ও সহিংসতার মধ্যে রয়েছে। অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন স্থানে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে ওঠে যা এখনো চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের প্রধান বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে মিয়ানমারের জন্য টিপিএস সুবিধা আর প্রয়োজন নেই। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ এক বিবৃতিতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে টিপিএস সুবিধাভোগী মিয়ানমারের নাগরিক প্রায় চার হাজার এবং তাঁদের জন্য সুবিধা ২৬ জানুয়ারি থেকে শেষ হয়ে যাবে।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটির প্রধান জানান, এই সিদ্ধান্ত টিপিএসকে তার মূল উদ্দেশ্য অর্থাৎ সাময়িক ভিত্তিতে সীমাবদ্ধ করছে। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে যে বার্মা নামেও পরিচিত দেশটির পরিস্থিতি এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে নাগরিকেরা ফিরে যেতে পারেন। তাঁর মতে, দেশটির সরকার ব্যবস্থা ও স্থিতিশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। জরুরি অবস্থার অবসান, স্বচ্ছ নির্বাচনের পরিকল্পনা, কার্যকর যুদ্ধবিরতি এবং স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন যে এসব উন্নতি জনসেবা এবং জাতীয় একীকরণকে এগিয়ে নিচ্ছে।
একটি আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ উল্লেখ করে যে মিয়ানমারের সামরিক প্রশাসন বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে আলোচনায় বসেছে এবং এতে চীনের মধ্যস্থতা ভূমিকা রেখেছে। আগের শান্তি উদ্যোগগুলোর তুলনায় এটিকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করছে তারা।
তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বহু পক্ষ এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত নয়। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা বলছে পরিকল্পিত নির্বাচন মুক্ত বা স্বচ্ছ হওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিছু বিরোধী দল এখনো নিষিদ্ধ এবং সাবেক রাজনৈতিক নেত্রী এখনো কারাবন্দী। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক পরিচালক মন্তব্য করেন যে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যায়ন বাস্তব অবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এবং সামরিক সরকারের ঘোষিত নির্বাচন কেবলমাত্র প্রদর্শনীর মতো।
টিপিএস সুবিধা বাতিলের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান দলের কিছু প্রভাবশালী নীতিনির্ধারকের অবস্থানের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির এক চেয়ারম্যান সামরিক সরকারের নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনাকে প্রতারণামূলক বলে মন্তব্য করেছেন এবং বলেন এটি বৈধতা অর্জনের কৌশল ছাড়া কিছু নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। প্রতিবেদনে বর্ণনা করা হয়েছে নির্বিচারে হত্যা, গুম, নির্যাতন, সংবাদমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ, ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ এবং সাধারণ মানুষের ওপর হামলার ঘটনা। বেসামরিক এলাকায় বিমান হামলা, কামানের গোলাবর্ষণ এবং দুই বিরোধী নেতার মৃত্যু নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
টিপিএস সুবিধার মেয়াদ আগের প্রশাসন ১৮ মাস বাড়িয়েছিল এবং এটি ২৫ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা ছিল। নতুন প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর টিপিএস বাতিলের মাধ্যমে অভিবাসন নীতিতে কঠোর অবস্থান বজায় রাখছে।



