শরীরে শীত শীত ভাবের সঙ্গে হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসা অনেকেরই দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার অংশ। বিশেষ করে সকালে বা সন্ধ্যায় কিংবা শীতের মৌসুমে এটি স্বাভাবিকভাবেই হতে পারে। তবে হঠাৎ হঠাৎ হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া বা সব সময় ঠান্ডা অনুভব হতে থাকলে তা শরীরের ভেতরে চলমান কিছু পরিবর্তন বা রোগের গুরুত্বপূর্ণ সংকেতও হতে পারে। তাই এমন অবস্থাকে অবহেলা না করে সম্ভাব্য কারণসমূহ জানা জরুরি।
মানবদেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রক্ত সঞ্চালনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রক্ত সঞ্চালন দুর্বল হলে প্রথম প্রভাব পড়ে হাত ও পায়ের মতো দূরবর্তী অঙ্গে। রক্তপ্রবাহ কম হওয়ার কারণ হিসেবে উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল কিংবা হৃদ্যন্ত্রের দুর্বলতা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। এসব কারণ রক্তকে সঠিকভাবে সারা শরীরে পৌঁছাতে বাধা দেয়, ফলে হাত পা দ্রুত ঠান্ডা লাগতে পারে।
রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়াও হাত পা ঠান্ডা হওয়ার আরেকটি সাধারণ কারণ। শরীরে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে গেলে রক্ত পর্যাপ্ত অক্সিজেন বহন করতে পারে না এবং এতে হাত পা ঠান্ডা লাগে। পাশাপাশি ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, ত্বকের ফ্যাকাশেভাবও দেখা দিতে পারে।
থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি বা হাইপোথাইরিডিজম শরীরের বিপাকক্রিয়াকে ধীর করে দেয়, যার ফলে শরীর স্বাভাবিক তাপ উৎপাদন করতে পারে না। এর সঙ্গে ওজন বৃদ্ধি, ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, সব সময় ঘুম ঘুম লাগা কিংবা চুল ঝরে যাওয়ার মতো উপসর্গও দেখা দেয়।
ডায়াবেটিসজনিত স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে অর্থাৎ ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি দেখা দিলে হাত পায়ে ঝিনঝিনভাব, জ্বালাপোড়া এবং ঠান্ডা অনুভূতি তৈরি হয়। দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তশর্করা থাকার ফলে স্নায়ুর কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং ওই অঞ্চলে রক্তপ্রবাহও দুর্বল হয়ে পড়ে।
ভিটামিনের ঘাটতি বিশেষ করে ভিটামিন বি১২, আয়রন এবং ফলেটের অভাব স্নায়ুর সুস্থতা বিঘ্নিত করে। এতে রক্তস্বল্পতা হতে পারে এবং হাত পা ঠান্ডা লাগার প্রবণতা বাড়ে। অনিয়ন্ত্রিত ধূমপান বা অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণের ফলে রক্তনালি সংকুচিত হয় এবং রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়ায় হাত পা দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যায়।
রেনোডস ডিজিজ নামে পরিচিত একটি অবস্থা রয়েছে, যেখানে ঠান্ডা আবহাওয়া বা মানসিক চাপের কারণে হাত পায়ের আঙুলের রক্তনালি হঠাৎ সংকুচিত হয়ে পড়ে। এতে আঙুল সাদা বা নীলচে হয়ে যায় এবং প্রচণ্ড ঠান্ডা লাগে। স্ট্রেস বা ঘুমের সমস্যাও সরাসরি রক্ত সঞ্চালনে প্রভাব ফেলতে পারে, ফলে হাত পা ঠান্ডা থাকার প্রবণতা বাড়ে।
তবে কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে। যেমন হাত পা সব সময় বরফের মতো ঠান্ডা থাকলে, আঙুলের রং সাদা বা নীল হয়ে গেলে, ঝিনঝিন ভাব অবশ ভাব বা জ্বালাপোড়া থাকলে, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা মাথা ঘোরা দেখা দিলে এবং ডায়াবেটিস বা থাইরয়েডের ইতিহাস থাকলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এমন সমস্যায় নিয়মিত ব্যায়াম রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়। পাশাপাশি গরম পানি দিয়ে হাত পা ভিজিয়ে রাখা, পর্যাপ্ত পানি পান করা, ভিটামিন ই, আয়রন ও ফলেটসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ এবং ধূমপান বা অতিরিক্ত চা কফি কমানো উপকারী। হাত পা ঠান্ডা হওয়া তুচ্ছ মনে হলেও এর পেছনে গুরুতর কারণ থাকতে পারে। তাই উপসর্গটি বারবার দেখা দিলে সতর্কভাবে বিষয়টি দেখা প্রয়োজন এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণই উত্তম।



