তানজানিয়ার সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর সৃষ্ট উত্তেজনা দ্রুত সহিংস রূপ নেয়। একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে ভোটের ফল নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হওয়ার পর দেশটির বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনী এবং অস্ত্রধারী টহলদল বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। ভিডিও বিশ্লেষণ, অডিও ফরেনসিক পরীক্ষা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা মিলিয়ে নিশ্চিত হয়েছে যে অনেক বিক্ষোভকারী নিরস্ত্র ছিল অথবা হাতে ছিল কেবল পাথর এবং লাঠি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনে রাষ্ট্রপ্রধান ২৯ অক্টোবর প্রায় পুরো ভোট পেয়েছেন বলে দাবি করেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়, যা জনরোষ তৈরি করে। একই সময়ে ভেরিফায়েড ভিডিওগুলোতে দেখা যায় বিভিন্ন হাসপাতালের মর্গে লাশের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
উপগ্রহচিত্র এবং ভিডিওর মাধ্যমে জানা গেছে দার এস সালামের উত্তরে কন্ডো কবরস্থানে তাজা মাটি খোঁড়ার চিহ্ন মিলেছে যা গণকবরের আশঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে। মানবাধিকার সংগঠন এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গত কয়েক সপ্তাহে নিহত বিক্ষোভকারীদের অনেককে সেখানে দাফন করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নির্বাচনের পর দেশজুড়ে কারফিউ জারি হয় এবং ইন্টারনেট সংযোগ আংশিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিরোধী নেতাকে এপ্রিল থেকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় আটক রাখা হয়েছে। ইন্টারনেট আংশিকভাবে ফিরে এলে ছবি ও ভিডিও শেয়ারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে পুলিশ। প্রথমদিকে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় কেউ নিহত হয়নি। পরে রাষ্ট্রপ্রধান সীমিত সংখ্যক হতাহতের কথা স্বীকার করলেও কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশ করেননি। তিনি একটি তদন্ত কমিশন গঠনের ঘোষণা দেন এবং অভিযোগ করেন যে বিক্ষোভকারীদের অর্থ দিয়ে মাঠে নামানো হয়েছে। সরকারের অন্য কর্মকর্তারা এই অনুসন্ধানী রিপোর্টে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর জানায়, দেশে বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী শত শত মানুষ নিহত অথবা আহত হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা যায় মানজা ও দার এস সালামের দুটি হাসপাতালে মর্গে লাশের সংখ্যা এতটাই বেড়ে গেছে যে সেগুলো ধারণক্ষমতার বাইরে চলে যায়। মানজার একটি হাসপাতালে অন্তত দশটি লাশ একটি স্ট্রেচারে গাদাগাদি করে রাখা ছিল। সেখানে দায়িত্ব পালন করা একজন চিকিৎসক জানান যে চার দিন ধরে গুলিবিদ্ধ মানুষ আনা হচ্ছিল। মর্গ পূর্ণ হয়ে গেলে লাশ বাইরে স্তূপ করে রাখা হয়। ওই চিকিৎসকের ভাষায় অধিকাংশ নিহতই তরুণ এবং সবার শরীরের বিভিন্ন অংশে গুলির ক্ষত ছিল।
দার এস সালামে একটি হাসপাতালের ভেতরের ভিডিওতে দেখা যায় মেঝেজুড়ে লাশের সারি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ভিডিওটির সত্যতা অস্বীকার করেছে। তবে এক নারী সাক্ষী জানান তিনি ভিডিওতে নিজের ভাইয়ের লাশ শনাক্ত করেছেন। হত্যার পর থেকে পরিবার তাকে খুঁজে ফিরছিল।
বিক্ষোভ শুরু হয় ভোটের দিন সকাল থেকেই। আরুশায় দুইজন বিক্ষোভকারীকে খুব কাছাকাছি ঝুঁকি না থাকলেও পুলিশের গুলিতে নিহত হতে দেখা যায়। একটি ভিডিওতে দেখা যায় গুলির মধ্যে দৌড়াতে থাকা এক তরুণীকে পিঠের দিকে গুলি করলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে জানা যায় তিনি তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। একই এলাকায় আরেক যুবককে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। ফরেনসিক অডিও বিশ্লেষণে জানা যায় উভয় ক্ষেত্রেই গুলির দূরত্ব প্রায় একশ মিটারের মতো।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষায়, আরুশার বিক্ষোভ শুরুতে শান্ত ছিল। পরে পুলিশ গুলি চালাতে শুরু করলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে সাধারণ পোশাকধারী অস্ত্রধারীদের পুলিশের সঙ্গে অভিযান চালাতে।
একটি ক্রীড়া ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান জানায় তাদের চুক্তিভুক্ত সাত তরুণ ফুটবলারকে নিজ নিজ বাসায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং তাদের মধ্যে ছয়জনের লাশ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একইভাবে আরও অনেক পরিবারের সদস্য নিখোঁজ রয়েছেন বলে অভিযোগ মিলেছে।
অভিযোগ রয়েছে যে দার এস সালামে নিহত বহু বিক্ষোভকারীকে কন্ডো কবরস্থানে গণকবরে দাফন করা হয়েছে। উপগ্রহচিত্রে দেখা যায় নভেম্বরের শুরুতে সেখানে নতুনভাবে মাটি খোঁড়া হয়েছে। মাটিচাপা অংশের ওপর কাপড় এবং গাছের শেকড় দেখা গেছে যা সাম্প্রতিক দাফনের ইঙ্গিত দেয়।
নির্বাচনের অস্থিরতার পর তানজানিয়ার স্থিতিশীল গণতন্ত্র হিসেবে আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। পর্যটননির্ভর এই পূর্ব আফ্রিকান দেশটি এখন এক ভয়াবহ মানবাধিকার সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে।



