গ্রিক দ্বীপগুলোতে ভ্রমণের মৌসুম শেষের পথে যখন পৌঁছালাম ততক্ষণে আমি সপ্তাহের তৃতীয় দ্বীপে অবস্থান করছি। অক্টোবরের মাঝামাঝি একটি ক্লাসিক সেলিং ক্রুজে বেরিয়েছিলাম এবং তখনই বুঝে গিয়েছিলাম পর্যটন মৌসুমের প্রাণশক্তি প্রায় নিঃশেষ। ফাঁকা রাস্তা আর বন্ধ দোকানপাট আমার জন্য আর নতুন ছিল না। গুগল ম্যাপস কোন রেস্টুরেন্ট খোলা দেখালেও গিয়ে দেখা যায় সেগুলো মৌসুম শেষে তালাবদ্ধ।
সকোপেলোস দ্বীপে একটি সুভেনির দোকানে গিয়ে দেখি আমি এবং আমার সহযাত্রীই যেন পুরো শহরের শেষ পর্যটক। দোকানের মালিককে জিজ্ঞেস করলাম আর কতদিন দোকান খোলা থাকবে। তিনি জানালেন আগামীকালই তারা মৌসুমের কার্যক্রম শেষ করবেন। কথা বলার সময় তার মুখে যে ক্লান্তির ছাপ দেখেছি অন্যান্য ব্যবসায়ীদের মধ্যেও ঠিক সেটাই দেখেছি। যেন তাদের অব্যক্ত প্রশ্ন ছিল, আমরা গ্রীষ্মকালজুড়ে পর্যটকদের সেবা দিয়েছি, এখনো কেন পর্যটকরা এখানে।
অক্টোবরের এই ভ্রমণে গ্রিস এবং তুরস্কের ছোট ছোট দ্বীপে যাওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন হবে তা নিয়ে আমি আগে থেকেই কৌতূহলী ছিলাম। সাধারণত এই রুটটি সৈকতকেন্দ্রিক। এবার ভ্রমণ তালিকায় ছিল দিকিলি, লেমনোস, স্কিয়াথোস, সকোপেলোস এবং পোরোস।
লেমনোসে পৌঁছে দেখি রাস্তা প্রায় জনশূন্য। তবে অক্টোবরের আবহাওয়া ছিল অত্যন্ত আরামদায়ক যা গ্রীষ্মের তীব্র গরমের তুলনায় ভ্রমণকে অনেক বেশি উপভোগ্য করে তোলে। লেমনোসে একটি পুরনো দুর্গে উঠেছিলাম, চারপাশের দৃশ্য উপভোগ করেছি আর পাহাড়ের ধারে লুকানো কোণে কয়টি বন্য ছাগলও দেখতে পেয়েছি। সেদিন আমরা সাইকেলে করে একটি ট্রেইলে যাই এবং সেখান থেকে পাথরের আড়ালে থাকা একটি পুরোনো গির্জায় উঠেছিলাম।
তুরস্কে প্রাচীন শহর পার্গামনে ঘণ্টাব্যাপী ঘুরে বেড়ানো ছিল অসাধারণ অভিজ্ঞতা যদিও সেখানে ছায়া খুব কম। প্রতিটি শহরে আঁকাবাঁকা পথ ধরে বেড়িয়েছি, স্থানীয়দের জীবনযাপন দেখেছি আর পথে পথে বিখ্যাত দ্বীপের অসংখ্য বিড়াল খুঁজে বেড়িয়েছি।
তাপমাত্রা যদিও সত্তরের ঘরে ছিল, তবুও রোদে দাঁড়ালে আরও উষ্ণ লাগত। ফলে বাইরে হাঁটা, ঘোরাঘুরি, দুর্গে ওঠা বা সাইকেল চালানো সবই ছিল বেশ আরামদায়ক। তবে সমুদ্রস্নানের ক্ষেত্রে বিষয়টি ততটা আকর্ষণীয় হয়নি। কয়েকজন যাত্রীসহ আমরাও সাঁতার কাটার চেষ্টা করেছি যদিও পানি যথেষ্ট ঠান্ডা ছিল।
ক্রুজটি গ্রীষ্মের মতো স্নরকেলিং গিয়ার, প্যাডলবোর্ড ও ছোট সেলবোট ব্যবহার করার সুবিধাও দিয়েছিল যা কিছু অতিথি উপভোগ করেছেন। খাবারের ক্ষেত্রে কিছুটা সমস্যায় পড়তে হয়েছে কারণ স্কিয়াথোস ও সকোপেলোসে বেশ কিছু রেস্টুরেন্ট মৌসুম শেষে বন্ধ ছিল। গুগল ম্যাপস খোলা দেখালেও গিয়ে দেখি দরজায় তালা। অনেকটা ঘুরে শেষ পর্যন্ত খোলা থাকা কয়েকটি রেস্টুরেন্টের একটিতে খেতে হয়েছে যদিও সেখানে বসে থাকা অতিথির সংখ্যা হাতে গোনা।
লেমনোসে স্থানীয়দের জন্য খোলা রেস্টুরেন্ট বেশি থাকায় সেখানে খাবারের অভিজ্ঞতা ভালো ছিল। সমুদ্রের ধারে ফাঁকা জায়গা থাকা একটি রেস্টুরেন্টে দ্বীপের বিশেষত্ব চিংড়ির পাস্তা খেয়ে বেশ সন্তুষ্ট হয়েছি।
অন্যদিকে জাহাজে অবস্থানকালে ঠান্ডা বাতাসের কারণে কেউই ডেকে বসে সময় কাটাতে তেমন আগ্রহী ছিল না। দুইটি সুইমিং পুলও সারাদিন খালি ছিল। জাহাজের সীমিত ইনডোর স্পেস এই সময়ে লক্ষ্যণীয় হয়ে ওঠে কারণ গ্রীষ্মের মতো ডেকে স্বাচ্ছন্দ্যে সময় কাটানো কার্যত সম্ভব ছিল না।
সব মিলিয়ে ছোট ইউরোপীয় দ্বীপে মৌসুম শেষে ভ্রমণ করা হবে কি না তা সম্পূর্ণ নির্ভর করবে ভ্রমণকারীর অগ্রাধিকারের ওপর। যদি প্রধান লক্ষ্য হয় ভিড় ছাড়া প্রকৃতি উপভোগ করা এবং স্থানীয় পরিবেশে হাঁটাহাঁটি, তাহলে সময়টা উপযুক্ত। তবে যদি লক্ষ্য থাকে সমুদ্রস্নান, রোদ পোহানো বা ব্যস্ত খাবারদাবারের অভিজ্ঞতা, তাহলে মৌসুম শেষে এই ভ্রমণ খুব মানানসই নাও হতে পারে।



