বিশ্বজুড়ে মানুষের আবাসন ব্যবস্থায় শহরের আধিপত্য যে কত দ্রুত বেড়েছে, সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংস্থার এক প্রতিবেদনে তার স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে। হাজার বছর ধরে শহর থাকলেও এর প্রকৃত বিস্তার মূলত গত শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে। ১৯৫০ সালে বিশ্ব জনসংখ্যার মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ শহরকেন্দ্রিক ছিল, অথচ বর্তমান পরিসংখ্যান বলছে বিশ্বের ৮০ ভাগের বেশি মানুষ এখন নগরজীবনের সঙ্গে যুক্ত। একসময় যে লন্ডন প্রথম শহর হিসেবে দশ লাখ মানুষের সীমা অতিক্রম করেছিল, বর্তমানে এমন শহরের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রবল জনবহুল মহানগর জাকার্তা এখন ৪ কোটি ২০ লাখ অধিবাসী নিয়ে টোকিওকে ছাড়িয়ে বিশ্বের বৃহত্তম নগরীতে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ দশটি মেগাসিটির মধ্যে নয়টিই এশিয়া মহাদেশে। এই নতুন পরিমাপের ফলে আগের তুলনায় নগরায়ণের হার একেবারে বদলে গেছে। ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে এই হার ছিল মাত্র ৫৫ ভাগ, যা এখন অনেকটাই উর্ধ্বমুখী।
জাকার্তার প্রবল জনসংখ্যা বৃদ্ধি এর সুফল যেমন আছে, তেমনি রয়েছে ব্যাপক দুর্ভোগ। ১৯৫০ সালের পর থেকে প্রায় ত্রিশ গুণ বেড়ে ওঠা এই মহানগর যানজট, বায়ুদূষণ, নিয়মিত জলাবদ্ধতা এবং ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে ক্রমশ নিচে বসে যাওয়ার চাপে সংকটে পড়েছে। এসব সমস্যা থেকে উত্তরণে সরকার রাজধানীর প্রশাসনিক কার্যক্রম সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে, যা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বোরনিও দ্বীপে নির্মাণাধীন নতুন প্রশাসনিক শহরে। তবে নতুন শহর প্রকল্প সাধারণত জটিলতার মধ্য দিয়ে এগোয়। একইভাবে নুসান্ত্রা নামের নতুন রাজধানীও সময়সূচির পিছিয়ে রয়েছে, বাজেট সংকটে ভুগছে এবং সম্ভাব্য বাসিন্দাদের আগ্রহও খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।
অন্যদিকে, অনেক সফল শহর কেবল পরিকল্পনার উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে না, বরং মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আগমনেই তাদের বিকাশ ঘটে। সাধারণভাবে ধারণা করা হয় উন্নত জীবিকা ও কর্মসংস্থানের জন্য তরুণরা শহরমুখী হয়। তবে বিশিষ্ট নগরবিশ্লেষকরা দেখিয়েছেন যে কৃষিখাতে অনিশ্চয়তা, আর্থিক নীতি বিধিনিষেধ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির দুরবস্থাও শহরমুখী মানুষের সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে শহর নিজেই গ্রামে ঢুকে পড়ে নগরায়ণ বিস্তারের মাধ্যমে। ফলে গ্রামীণ মানুষ শহরের সংস্পর্শে এসে আর্থসামাজিক পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়।
শহরের সুফল অনস্বীকার্য। এগুলো অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের কেন্দ্র, যেখানে কর্মসংস্থান, ব্যবসা, সংস্কৃতি ও উদ্ভাবন দ্রুত বিকাশ লাভ করে। উদাহরণ হিসেবে নিউইয়র্ক শহরের বার্ষিক উৎপাদন মূল্য তুরস্ক বা সৌদি আরবের মোট দেশজ উৎপাদনকে ছাড়িয়ে গেছে। এত বড় অর্থনৈতিক শক্তি শহরগুলিকে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগও তৈরি করে।
যদিও সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও বড়। উন্নত সেবা ও অবকাঠামোর পাশেই বাস করে নিম্নমানের আবাসন, অতিরিক্ত ভিড় এবং চরম বৈষম্যের বাস্তবতা। ঘনবসতিপূর্ণ ও উচ্চমাত্রায় চলাচলকারী জনগোষ্ঠীতে রোগের বিস্তার দ্রুত ঘটে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা বা কর্মজীবনের আশায় মানুষের সিদ্ধান্ত যৌক্তিক হলেও বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে তা সরকার ও নীতিনির্ধারকদের জন্য নতুন হুমকি তৈরি করে।
গত ৫৫ বছরে যে পরিমাণ ভূমি নগরায়িত হয়েছে তার বড় অংশই ছিল কৃষিজমি, যা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। শহর ও গ্রামের সম্পর্ক মজবুত করা এখন সময়ের দাবি, যাতে গ্রামের মানুষ সেবা থেকে বঞ্চিত না হয়। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন শহরগুলোকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তাপদাহ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং চরম আবহাওয়ার প্রভাব শহরবাসীদের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়ে, আর এর ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হয় নিম্নআয়ের মানুষের।
আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধান গতবছর মন্তব্য করেছিলেন যে টেকসই এবং সমতাভিত্তিক নগরায়ণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা একই লক্ষ্য পূরণের পথ। কারণ, শহর যেমন বিপুল পরিমাণ কার্বন নির্গমন ঘটায়, তেমনি দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত করতেও পারে।
শহর বরাবরই সুযোগ ও বিপদের মিশ্র বাস্তবতা। এগুলো নিজেদের গতিতে বেড়ে ওঠে, কিন্তু সেখানে আগত মানুষের বিকাশ নিশ্চিত করতে সুচিন্তিত পরিকল্পনা অপরিহার্য। মানুষ এখন এক ধরনের নতুন নগর প্রজাতিতে পরিণত হয়েছে, যে ঘর নিজেই গড়ে তুলেছে সে এখনো শিখছে কীভাবে সেখানে খাপ খাওয়াতে হয়।



