ভবিষ্যতের বৈদ্যুতিক গাড়ি ও বৈদ্যুতিক উড্ডয়নের সম্ভাবনা আরও জোরালো হতে যাচ্ছে। জাপানের জাতীয় উপাদান বিজ্ঞান গবেষণা সংস্থা এবং একটি শীর্ষস্থানীয় কার্বন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের যৌথ গবেষণা দলে উদ্ভাবিত নতুন ধরনের কার্বন ইলেকট্রোড লিথিয়াম এয়ার ব্যাটারির কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।
গবেষণা দলটি ৪ সেন্টিমিটার গুণ ৪ সেন্টিমিটারের ইলেকট্রোড ব্যবহার করে এক ওয়াট আওয়ার ক্ষমতার একটি স্ট্যাকড লিথিয়াম এয়ার ব্যাটারির প্রোটোটাইপ তৈরি করেছে এবং এটিকে স্থিতিশীলভাবে চালাতে সক্ষম হয়েছে। এই সাফল্য দেখায় যে প্রযুক্তিটি শিল্প পর্যায়ে বড় আকারে প্রয়োগ করা সম্ভব।
ওজন কম এবং শক্তি সঞ্চয় ক্ষমতা বেশি হওয়ায় এই ব্যাটারি প্রযুক্তি ভবিষ্যতের বৈদ্যুতিক উড়োজাহাজ ও বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এতদিন যে তিনটি প্রধান সীমাবদ্ধতা ব্যাটারিটির উন্নয়নকে থামিয়ে রেখেছিল, যেমন কম আউটপুট, স্বল্প স্থায়িত্ব এবং বড় আকারে উৎপাদনের অক্ষমতা, নতুন গবেষণা সেই বাধাগুলো কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেছে।
স্কেলিং নিয়ে দীর্ঘ দিনের চ্যালেঞ্জ
লিথিয়াম এয়ার ব্যাটারি দীর্ঘদিন ধরে সম্ভাবনাময় একটি ধারণা হিসেবে পরিচিত। এতে শক্তি সঞ্চয়ের ক্ষমতা প্রচলিত লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির তুলনায় অনেক বেশি, ফলে এক চার্জে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করা সম্ভব। তবে এর আগে গবেষকদের তৈরি ছোট ব্যাটারিগুলোর শক্তি ০.০১ ওয়াট আওয়ারের কম ছিল, যা বাস্তব কোনো বড় ডিভাইসে ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট ছিল না।
২০২১ সালে জাতীয় উপাদান বিজ্ঞান গবেষণা সংস্থা প্রায় ৫০০ ওয়াট আওয়ার প্রতি কিলোগ্রাম শক্তি ঘনত্বের একটি লিথিয়াম এয়ার ব্যাটারি তৈরি করেছিল, যা প্রচলিত ব্যাটারির তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। যদিও তাতে শক্তি ঘনত্বের অগ্রগতি ছিল, কিন্তু উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন আউটপুট এবং দীর্ঘ স্থায়িত্বের অভাবে ব্যবহারিক প্রয়োগ তখনো সীমিত ছিল। মূল সমস্যা ছিল আদর্শ ঘনত্ব ও স্থায়িত্বসম্পন্ন কার্বনভিত্তিক পজিটিভ ইলেকট্রোড তৈরি করা।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দলটি এমন একটি কার্বন ইলেকট্রোড তৈরি করেছে যা বৃহৎ আকারের ব্যাটারি উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে। উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে বিশেষভাবে ডিজাইনকৃত মেসোপোরাস কার্বন উপাদান এবং স্বতন্ত্রভাবে তৈরি কার্বন মেমব্রেন প্রযুক্তি। এই সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে স্তরযুক্ত ছিদ্রময় কাঠামোর ইলেকট্রোড, যা আয়নের চলাচল এবং ব্যাটারির রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া আরও কার্যকর করে।
উন্নত শক্তি আউটপুট ও দীর্ঘস্থায়িত্ব
গবেষণায় দেখা গেছে যে ৪ সেন্টিমিটার গুণ ৪ সেন্টিমিটারের কার্বন ইলেকট্রোড ব্যবহার করে তৈরি ব্যাটারি স্থিতিশীলভাবে এক ওয়াট আওয়ার শক্তি উৎপাদনে সক্ষম হয়েছে। নতুন কাঠামোর কার্বন মেমব্রেন এবং কম ইলেকট্রোলাইট ব্যবহার করে তৈরি ব্যাটারিটি উচ্চ কারেন্ট ঘনত্বে ১৫০টিরও বেশি চার্জসাইকেল ধরে স্থির পারফরম্যান্স বজায় রাখে।
অনন্য ইলেকট্রোড নকশার কারণে ব্যাটারি উচ্চ আউটপুট দিতে সক্ষম, যা বৈদ্যুতিক গাড়ির তাত্ক্ষণিক অ্যাক্সিলারেশন কিংবা এয়ার ট্যাক্সির উল্লম্ব উড্ডয়নের জন্য অপরিহার্য। একই সঙ্গে উন্নত কার্বন স্ফটিক কাঠামো ইলেকট্রোডের স্থায়িত্ব বাড়ায় এবং ব্যাটারির আয়ু দীর্ঘ করে।
গবেষক দল বড় আকারের ইলেকট্রোড উৎপাদনের পদ্ধতিও তৈরি করেছে, যা ১০ সেন্টিমিটার গুণ ১০ সেন্টিমিটার বা তারও বড় হতে পারে। এটি ভবিষ্যতের বৃহৎ শক্তি ঘনত্বের ব্যাটারি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমানে শীর্ষমানের লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি ৩০০ ওয়াট আওয়ার প্রতি কিলোগ্রাম সীমা অতিক্রম করতে সংগ্রাম করছে, সেখানে লিথিয়াম এয়ার প্রযুক্তির সম্ভাব্য শক্তি ঘনত্ব ভবিষ্যতে গ্যাসোলিনের সমতুল্য পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এই উন্নয়ন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বৈদ্যুতিক গাড়ির স্বল্প রেঞ্জের সীমাবদ্ধতা এবং আকাশে উড্ডয়নের স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হওয়ার সময় আর বেশি দূরে নয়।



