যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঢেউ যখন ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে, ঠিক সেই সময় এক বিচারিক আদেশে মুক্তি পেয়েছে পাঁচ বছর বয়সী এক শিশু ও তার বাবা। সাম্প্রতিক এই ঘটনাপ্রবাহ ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতিতে ভাষাগত ও কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সপ্তাহজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে ‘আইস আউট’ স্লোগান তুলে রাজপথে নামে হাজারো মানুষ। শুক্রবার দেশব্যাপী ধর্মঘটের পর শনিবার দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপকূল থেকে উপকূল পর্যন্ত বহু স্কুল, অফিস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। বিক্ষোভ শুরু হওয়ার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জানান, ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বাধীন শহরগুলোতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে সহায়তা না চাইলে স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগকে আন্দোলন দমনে হস্তক্ষেপ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই অবস্থানের প্রতিধ্বনি শোনা যায় স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের সচিবের বক্তব্যেও। রোববার এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, প্রতিটি পরিস্থিতি থেকেই শেখার সুযোগ রয়েছে এবং উত্তেজনা কমাতে আরও ভালো করা সম্ভব। এই বক্তব্য আগের সপ্তাহের কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত এক ব্যক্তির ঘটনায় কঠোর ভাষায় মন্তব্য করলেও সেই দাবি ভিডিও ফুটেজ ও প্রমাণের অভাবে প্রশ্নের মুখে পড়ে।
মিনিয়াপোলিসকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, পোর্টল্যান্ড ও অস্টিনসহ বড় বড় শহরে ছড়িয়ে পড়ে। দুটি হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে অভিবাসন প্রয়োগের কৌশল নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে, যা হোয়াইট হাউসের সাম্প্রতিক অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে প্রশাসনের নীতিনির্ধারণে শেষ কথা বলবেন প্রেসিডেন্ট নিজেই—এমন মন্তব্য করেন হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র। তিনি জানান, মাঠপর্যায়ে কৌশল পর্যালোচনার জন্য সীমান্তবিষয়ক বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে পাঠানো হলেও নীতিগত পরিবর্তনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্টই নেবেন।
এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই আদালতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসে। টেক্সাসের একটি আটক কেন্দ্র থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশু ও তার বাবাকে মুক্তির নির্দেশ দেন এক ফেডারেল বিচারক। রায়ে বিচারক প্রশাসনের অভিবাসন প্রয়োগ কৌশলের কঠোর সমালোচনা করেন এবং বলেন, দৈনিক বহিষ্কার কোটা পূরণের তাড়নায় এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা শিশুদের মানসিকভাবে আঘাত করছে। এক সপ্তাহের বেশি সময় আটক থাকার পর রোববার সকালে তারা মিনিয়াপোলিসে ফিরে আসে বলে জানান টেক্সাসের এক কংগ্রেস সদস্য।
শিশুটির আটক হওয়ার ঘটনা অভিবাসন প্রয়োগে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগকে আরও জোরালো করে তোলে। স্থানীয় বাসিন্দা ও নির্বাচিত প্রতিনিধিরা এই ঘটনাকে মানবিক সংকট হিসেবে দেখছেন এবং ফেডারেল সরকারের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করছেন।
তবে সব ক্ষেত্রে আদালতের রায় আন্দোলনকারীদের পক্ষে আসেনি। মিনেসোটা অঙ্গরাজ্য এবং সেন্ট পল ও মিনিয়াপোলিস শহরের পক্ষ থেকে ‘অপারেশন মেট্রো সার্জ’ স্থগিতের আবেদন খারিজ করে দেন আরেক বিচারক। এই অভিযানে হাজারো ফেডারেল এজেন্ট মোতায়েন করা হয়েছে। স্থানীয় ও অঙ্গরাজ্য সরকার একে ওয়ারেন্টবিহীন গ্রেপ্তার ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ‘ফেডারেল আগ্রাসন’ আখ্যা দিয়ে মামলা করেছিল। রায়ে অভিযান চালু রাখার অনুমতি দেওয়া হলেও মামলাটি চলমান থাকবে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ সন্তোষ প্রকাশ করলেও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ হতাশা জানিয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়।
অন্যদিকে শিকাগোতে শহরের মেয়র একটি নির্বাহী আদেশে স্থানীয় পুলিশকে ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তাদের কথিত অসদাচরণ তদন্ত ও নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেন, যাতে প্রয়োজন হলে মামলা করা যায়। একই সময়ে কয়েকটি জেলার কৌঁসুলিরা ফেডারেল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আইনভঙ্গের ঘটনায় সহায়তার জন্য জোট গঠন করেছেন।
মিনেসোটায় এক চার্চে বিক্ষোভ চলাকালে আটক হওয়া দুই সাংবাদিকও পরে মুক্তি পান। তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে বিচার বিভাগ বলছে, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সীমান্তবিষয়ক বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্থানীয় কারাগারগুলো সহযোগিতা করলে ভবিষ্যতে মিনেসোটায় ফেডারেল এজেন্টের সংখ্যা কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে, যদিও এ নিয়ে প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে ভিন্ন সুর শোনা গেছে।
সবশেষে, সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত ব্যক্তির ঘটনায় বিচার বিভাগ একটি নাগরিক অধিকার তদন্ত শুরু করেছে। এতে আইন লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে বলে জানানো হয়েছে। চলমান এই ঘটনাপ্রবাহ যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি ও প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ককে আরও গভীর করেছে।



