Saturday, January 3, 2026
spot_img
Homeকমিউনিটি সংবাদলস অ্যাঞ্জেলেসে ছোট্ট বাংলাদেশি ঠিকানা

লস অ্যাঞ্জেলেসে ছোট্ট বাংলাদেশি ঠিকানা

লস অ্যাঞ্জেলেসের ঝলমলে নগরজীবনের ভেতরেও রয়েছে এমন এক এলাকা যেখানে দাঁড়ালে মনে হতে পারে যেন ঢাকা শহরের কোনো ব্যস্ত সড়কে এসে পড়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের এই নগরীতে থার্ড স্ট্রিটের নিউ হ্যামশায়ার থেকে আলেকজান্দ্রিয়া অ্যাভিনিউ পর্যন্ত বিস্তৃত এই অংশটি পরিচিত লিটল বাংলাদেশ নামে, যা প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এক পরিচিত ও আবেগময় আবাসস্থল।

থার্ড স্ট্রিটে নীল রঙের লিটল বাংলাদেশ লেখা সাইনবোর্ড দেখলেই পরিবেশ বদলে যায়। আশপাশের শব্দ, মানুষের চলাচল, বাংলায় লেখা দোকানপাট এবং স্থানীয়দের কথাবার্তা মিলিয়ে এলাকা যেন রাজধানীর কোনো পরিচিত বাজার। ব্যস্ত রাস্তা, বাংলা খাবারের ঘ্রাণ, ছোট দোকানের সামনে তরুণদের আড্ডা সব মিলিয়ে মনে হয় এ যেন বিদেশে এক টুকরো নিজস্ব প্রিয় শহর।

হলিউডের ঝলমলে আলো থেকে মাত্র তিন মাইল দূরে এই ছোট বাংলাদেশি পল্লী গড়ে উঠেছে প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন এবং সাংস্কৃতিক বন্ধনকে কেন্দ্র করে। প্রবাসের শহরের ট্রাফিক, গাছপালার সারি এবং পাশের আমেরিকান জীবনযাত্রা একদিকে যেমন লস অ্যাঞ্জেলেসের কথা মনে করিয়ে দেয়, ঠিক তেমনি স্থানীয় খাবার, বাংলায় লেখা সাইনবোর্ড এবং পরিচিত আড্ডার পরিবেশ আবার বাংলাদেশকেও স্মরণ করায়।

এলাকার দোকানগুলোতে রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার, রেস্টুরেন্ট, সেলুন, মোবাইল শপ এবং মানি ট্রান্সফার কাউন্টার। ভাজা সামোसा, পুরি, পেঁয়াজু কিংবা কাবাবের ঘ্রাণে পথজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এক পরিচিত স্বাদ। দোকানের ভেতরে চলতে থাকে বাংলা গান, টিভিতে দেখা যায় বাংলাদেশি সংবাদ। তরুণদের আড্ডা চলে মুড়ি, চানাচুর কিংবা চায়ের কাপ হাতে। সব মিলিয়ে এটি যেন আরেকটি শহরের ভেতরে এক ছোট্ট বাংলাদেশ।

প্রবাসীদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারী একটি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক জানান, লিটল বাংলাদেশ আসলে পুরো কমিউনিটির হৃদয়। এটি শুধু বসবাসের জায়গা নয়, বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখার কেন্দ্রবিন্দু। আরেকজন দীর্ঘদিনের প্রবাসী জানান, প্রথমে শহরের অন্য এলাকায় থাকতেন, কিন্তু সেখানে একাকিত্ব অনুভব করতেন। লিটল বাংলাদেশে আসার পর আর কখনো সেই অনুভূতি হয়নি। সপ্তাহান্তে তিনি এখানকার রেস্টুরেন্টে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটান।

এই এলাকার দোকান কর্মীদের মতে, প্রতিদিনই এখানে আসে বিভিন্ন মানুষের ভিড়। কেউ ছাত্র, কেউ ব্যবসায়ী, কেউবা দীর্ঘদিনের অভিবাসী। তারা আড্ডা দিতে দিতে গল্প করেন দেশের পরিস্থিতি নিয়ে। পরিচিত নামের দোকান যেমন কস্তুরি, দেশি, সোনার বাংলা, স্বদেশ কিংবা এশিয়ান মার্ট একধরনের স্মৃতির জগৎ তৈরি করে। নিকটবর্তী একটি মিষ্টির দোকানে পাওয়া যায় রসগোল্লা, সন্দেশ, লালমোহনসহ নানা স্বাদের মিষ্টি যা মুহূর্তেই বাংলাদেশে নিয়ে যায়।

লিটল বাংলাদেশের ইতিহাস শুরু গত শতকের ছয় দশকে। উচ্চশিক্ষার জন্য আসা কয়েকজন বাংলাদেশি ধীরে ধীরে এখানে বসবাস শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠে ব্যবসা, রেস্টুরেন্ট, বাজারসহ নানা প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ২০১০ সালে শহর কর্তৃপক্ষ এলাকাটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে লিটল বাংলাদেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

বর্তমানে এখানে বসবাস করছেন প্রায় দশ হাজার বাংলাদেশি। শুধু বসবাস নয়, তারা শহরের অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন। ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকা প্রায় দুই হাজার বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীদের বড় অংশও লস অ্যাঞ্জেলেসে অবস্থান করেন এবং এদের অনেকেই এই এলাকাতেই থাকেন বা সময় কাটান। তাদের কাছে লিটল বাংলাদেশ মানে পরিবার, বন্ধুত্ব ও পরিচিত সংস্কৃতির আশ্রয়।

এলাকাজুড়ে রয়েছে কয়েকটি মসজিদ যা স্থানীয় মুসলিম কমিউনিটিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রাথমিক অভিবাসনের ইতিহাস বহন করে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান, ঈদের আয়োজন, সামাজিক সহায়তা সবকিছুই পরিচালনা করেন এসব মসজিদের পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা। তাদের একজন জানান, এলাকার বাংলাদেশিদের বাসস্থান থেকে শুরু করে চাকরি এবং বিশেষত দাফনের ব্যবস্থায়ও তারা সহযোগিতা করেন।

সারা বছর জুড়ে লিটল বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয় নানা উৎসব। বাঙালি ঐতিহ্যের মেলা, সংগীত উৎসব, বৈশাখী আয়োজন, জাতীয় দিবসের কর্মসূচি প্রবাসীদের সাংস্কৃতিক বন্ধনকে আরও মজবুত করে। বিভিন্ন সংগঠন একত্র হয়ে বাংলা সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতিকে ছড়িয়ে দিতে কাজ করে যাচ্ছে।

স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রধানের ভাষায়, লিটল বাংলাদেশ শুধু একটি এলাকা নয়, বরং বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। প্রবাসে বেড়ে ওঠা শিশুদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ে গড়ে উঠতে এই এলাকার ভূমিকা অনন্য।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments