Thursday, January 1, 2026
spot_img
Homeসম্পাদকীয়রাজপরিবারের সম্পত্তি তদন্তে নতুন অধ্যায়

রাজপরিবারের সম্পত্তি তদন্তে নতুন অধ্যায়

ব্রিটেনের রাজপরিবার নিয়ে সাধারণ মানুষের মতামত যতই প্রবল হোক, দেশটির সংসদ বহু দশক ধরে এই বিষয়ে কার্যত নীরব। দীর্ঘকালীন প্রথায় হাউস অব কমন্স নিজেকে বাধ্য করেছে এমন একটি অবস্থানে, যেখানে রাজতন্ত্রকে কেন্দ্র করে কোনো আলোচনা চলে না। বহু শতাব্দীর পুরোনো এই প্রচলন আজকের আধুনিক গণতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে বেমানান হয়ে উঠেছে। যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক রাজতন্ত্র নিয়ে সংসদ কথা বলতে পারে না, এমন প্রথা এখন আর গ্রহণযোগ্য নয়।

তবে এবার পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। এই সপ্তাহে সংসদের পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি ক্রাউন এস্টেট নিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে। অবনমিত প্রাক্তন ডিউক অফ ইয়র্ক এবং তার ভাই ওয়েসেক্সের আর্ল ক্রাউন এস্টেটের মালিকানাধীন বৃহৎ সম্পত্তি অত্যন্ত কম ভাড়ায় ব্যবহার করছিলেন, এমন তথ্য প্রকাশ্যে আসার পরই এই তদন্ত শুরু হয়েছে। আধুনিক সময়ে এমন পদক্ষেপ নেওয়া সত্যিই ব্যতিক্রমী।

ক্রাউন এস্টেট ১৯৬১ সালে আইনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত একটি সরকারি সংস্থা। এটি রাজা বা সরকারের অধীনে পরিচালিত হয় না এবং দেশটির অন্যতম লাভজনক সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। প্রায় ১৫.৫ বিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের এই সংস্থা প্রতিবছর বিপুল মুনাফা অর্জন করে। ২০১১ সালে সিভিল লিস্ট বাতিল হওয়ার পর থেকে রাজপরিবার এস্টেটের লাভ থেকে উদার ও সুরক্ষিত ‘সোভরেন গ্রান্ট’ পেয়ে আসছে। সমুদ্রবায়ে শক্তি প্রকল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে আয় বাড়ায় রাজপরিবার এই গ্রান্টের মাধ্যমে এমন অর্থ পাচ্ছে যা মূলত ট্রেজারির রাজস্ব হওয়ার কথা ছিল। ২০২৬ সালে এই ব্যবস্থার পুনর্বিবেচনা হওয়ার কথা, যা চলমান তদন্তের আওতাভুক্ত হওয়া প্রয়োজন।

রাজপরিবারের আর্থিক বিষয় সংসদের পূর্ণ জবাবদিহির আওতায় থাকা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। গার্ডিয়ানের ‘কস্ট অব দ্য ক্রাউন’ সিরিজেও বহুদিন ধরে এমন পর্যবেক্ষণের দাবি জানানো হয়েছিল। গত সপ্তাহে কমিটির চেয়ারম্যানকে দেওয়া একটি চিঠিতে ট্রেজারি স্বীকার করেছে যে এস্টেট কমিশনারদের আইনগত দায়িত্ব হলো সংস্থার সম্পদের মূল্য রক্ষা এবং তা বাড়ানো। অর্থাৎ, জনসম্পদের সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করাই তাদের দায়িত্ব।

কমিটি তাই তাদের স্বাভাবিক কর্তব্যই পালন করছে। এই তদন্তের ফল সমাজে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেবে এবং তা যুক্তিযুক্তও। জনস্বার্থে ব্যয়ের যুক্তিযুক্ততা নিশ্চিত করাই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, যা সংসদে রাজতন্ত্রকে ঘিরে নতুন ধরনের বিতর্কের দরজা খুলে দিতে পারে। এমন পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে বাকিংহাম প্যালেসের জন্য স্বস্তির নয়। একই সপ্তাহে বিবিসির ‘হোয়াটস দ্য মনার্কি ফর?’ সিরিজ সম্প্রচার শুরু হওয়া সময়ের পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দেয়।

সামাজিক মনোভাবের পরিবর্তনের বাইরে আরও একটি বিষয় এই তদন্তকে গুরুত্ব দিয়েছে। সেটি হলো রাজপরিবারকে বরাদ্দ করা তথাকথিত ‘গ্রেস অ্যান্ড ফেবার’ আবাসগুলোর চুক্তির শর্ত, যেগুলো এতদিন জনসমক্ষে আসেনি। এসব সম্পত্তি কী শর্তে বরাদ্দ হয়, রক্ষণাবেক্ষণের দায় কে নেয়, তা এবার উন্মুক্ত হতে পারে। এতে প্রাক্তন ডিউক অফ ইয়র্ক এবং রাজপ্রাসাদের জন্য আরও অস্বস্তিকর তথ্য উঠে আসার সম্ভাবনাও রয়েছে।

কমিটিকে এই কঠিন কাজ থেকে পিছু হটার কোনো কারণ নেই। জনসেবার অন্যান্য খাতের মতো রাজতন্ত্রের ক্ষেত্রেও ব্যয়ের যথার্থতার প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাবেক লিবারেল ডেমোক্র্যাট মন্ত্রী নরম্যান বেকার উল্লেখ করেছেন যে তদন্তের মান বিচার হবে আংশিকভাবে এই ভিত্তিতে যে, রাজপরিবারের মোট কতটি অনুদানপ্রাপ্ত আবাস রয়েছে এবং সেগুলোর ব্যয় কত। তার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালে এমন আবাসের সংখ্যা ছিল ২৭২। অথচ বর্তমানে ‘কর্মরত’ রাজপরিবারের সদস্য মাত্র ১১ জন।

এই তদন্ত তাই শুধু একটি আর্থিক বিশ্লেষণ নয়। এটি ব্রিটেনের রাজতন্ত্রকে ঘিরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আধুনিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments