উত্তর মোজাম্বিকের উপকূলীয় শহর মোসিম্বোয়া দা প্রাইয়ায় গত মাসে সন্ধ্যার দিকে নোনা হাওয়া ভেসে আসছিল, আর ঠিক সেই সময় সাতজন সশস্ত্র ও ইউনিফর্ম পরা ব্যক্তি স্থানীয় এক জেলে পাড়ায় ঢুকে মসজিদের চাবি দাবি করে। ভেতরে ঢুকে নামাজের ডাকের জন্য ব্যবহৃত মাইক্রোফোন দিয়ে তারা এলাকাবাসীকে ডেকে আনে। মসজিদের ইমাম জানান, তারা জঙ্গি সংগঠন আইএসের পতাকা উন্মোচন করার পরই সবার কাছে স্পষ্ট হয় কারা এসেছে এবং তাদের আগের তুলনায় বাড়তি আত্মবিশ্বাসও নজরে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা হঠাৎ কমে যাওয়ার পর গত কয়েক মাসে জঙ্গিগোষ্ঠী নতুন গতি পেয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
ইমাম জানান, পতাকা দেখা মাত্রই তিনি ও তার সহকর্মী জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়ার কথা বলে নিকটস্থ সামরিক সদস্যদের খবর দিতে যান। ভিডিওতে দেখা যায়, জঙ্গিদের মুখ খোলা ছিল এবং তারা স্থানীয় ভাষায় অত্যন্ত পরিকল্পিত ভাষণে নিজেদের ক্ষমতা ও উদ্দেশ্য জানায়। স্থানীয়রা পালিয়ে না গিয়ে মনোযোগ দিয়ে ঘটনা রেকর্ড করছিল। এভাবে তারা দেখিয়ে দিল, কোথায় কোথায় অনায়াসে ঘুরে বেড়াতে পারে।
প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ কাবো দেলগাডো অঞ্চলে গত আট বছর ধরে সহিংসতা ও জমি দখলের ঘটনা চলছে। ২০২০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত জঙ্গিরা এ উপকূলীয় শহর নিয়ন্ত্রণ করে, যা বহু মানুষকে বাস্তুচ্যুত করে। পরে মোজাম্বিক ও রুয়ান্ডার যৌথ সামরিক অভিযান আংশিক স্থিতি ফিরিয়ে আনে এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সহায়তা জোরদার হয়। অনেক পালিয়ে যাওয়া মানুষ তখন ফিরে আসে।
কিন্তু চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক আদেশে ইউএসএইডের বড় অংশ ভেঙে দেওয়া হলে কিছু সহায়তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, আর কিছু প্রকল্প উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এসব প্রকল্পের মধ্যে ছিল স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা, চরমপন্থার বিস্তার ঠেকানো ও জীবনমান উন্নয়নের উদ্যোগ।
৭ সেপ্টেম্বর থেকে আইএস আবার আক্রমণ চালাতে শুরু করে এবং তাদের পুরোনো ঘাঁটি মোসিম্বোয়া দা প্রাইয়ায় ফের হামলা চালায়। কয়েক সপ্তাহ ধরে অসংখ্য খ্রিস্টান পুরুষকে হত্যা করা হয়, বহু মানুষ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়। আফ্রিকা জুড়ে আইএস হামলা বাড়ছে এবং জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তাদের মোট বৈশ্বিক কর্মকাণ্ডের ৭৯ শতাংশই এ মহাদেশে ঘটেছে বলে এক গবেষণা জানায়।
মোজাম্বিকে ইউএসএইড ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎস। দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা জনসংখ্যা দেশের অর্ধেকেরও বেশি এবং গড় বয়স মাত্র ১৭। ২০২৪ সালে সংস্থাটির প্রদান করা সহায়তা ছিল প্রায় ৫৮৬ মিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির প্রায় তিন শতাংশ। জরুরি খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, শিক্ষা, স্থানীয় প্রশাসনসহ স্বাস্থ্যসেবা ও এইচআইভি চিকিৎসা—সবই এসব সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল।
ইউএসএইডের অর্থায়নে যুবকরা যাতে জঙ্গি দলে না যায়, সে লক্ষ্যে মোটরসাইকেল ট্যাক্সিচালক ও জেলেদের নিয়ে দুটি প্রকল্প চালু ছিল। হঠাৎ সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের হতাশা আরও বেড়ে যায়। সংস্থাটির সাবেক এক কর্মকর্তা জানান, দারিদ্র্য ও বঞ্চনাই ছিল জঙ্গি নিয়োগের প্রধান ভিত্তি এবং ইউএসএইড সেই শেকড়েই কাজ করছিল। সব কার্যক্রম থেমে যাওয়ায় সহিংসতা ঠেকানোর প্রচেষ্টায় বড় শূন্যতা তৈরি হয়।
স্থানীয় হাসপাতালের উপপরিচালক জানান, ইউএসএইড তহবিল বন্ধ হওয়ায় শুরুতে ১৫ জনের মতো কর্মী ছাঁটাই করতে হয় এবং ব্যথানাশকসহ প্রয়োজনীয় ওষুধের ঘাটতি দেখা দেয়। বাজারে মোটরসাইকেল চালকদের উষ্মার কারণও একই—সহায়তা বন্ধ হওয়ায় তারা আবার জঙ্গিদের সহজ লক্ষ্য হয়ে উঠছে।
জেলেদের সহায়তার আরেকটি প্রকল্পও বন্ধ হয়েছে, যার মাধ্যমে নৌযান, জাল ও কাগজপত্রের কাজে সাহায্য করা হতো এবং পাশাপাশি জঙ্গি নিয়োগের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ করা হতো। এলাকার অনেক জেলে তরুণ, যাদের টার্গেট করা সহজ। সহিংসতা এতটাই বিস্তৃত যে অনেকের ব্যক্তিগত জীবনেও এর গভীর প্রভাব পড়েছে; একজন উন্নয়নকর্মীর দুই ছেলেমেয়ে এখনো নিখোঁজ।
শহরের বাইরের খ্রিস্টান অধ্যুষিত এলাকায় জঙ্গিদের রাতের হামলায় একাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়। একজন নিরাপত্তারক্ষীকে ঘরে ঢুকে নাম ধরে ডেকে নিয়ে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়, যার বিবরণ দিতে গিয়ে পরিবারের সদস্যরা ভেঙে পড়েন। তার পরিবার এখন অন্যত্র আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
মুয়েদা শহরে একসময় বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা কাজ করত, কিন্তু সহায়তা বন্ধ হওয়ায় অনেক অফিস বন্ধ হয়ে গেছে। আশপাশের ক্যাম্পগুলোতে প্রায় ৯৩ হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ জীবনধারণের জন্য সংগ্রাম করছে। নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলসহ বিভিন্ন সংস্থা অল্প সহায়তা নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছে, যদিও তহবিলঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।
উত্তরাঞ্চলের এই সংকটের মাঝেই পাম্বা উপকূলে বিপুল গ্যাসসম্পদ থাকা সত্ত্বেও জঙ্গি হামলার কারণে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকল্প পিছিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বিনিয়োগ সহায়তা দিয়েছে বটে, কিন্তু ক্রমবর্ধমান সহিংসতা প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যতকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।



