মার্কিন অর্থনীতিতে একটি অস্বাভাবিক প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং শ্রমবাজার স্থিতিশীল রাখতে দায়িত্বপ্রাপ্ত নীতিনির্ধারকদের উদ্বিগ্ন করে তুলছে।
এই বছর যুক্তরাষ্ট্রে কোম্পানিগুলো নিয়োগ কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। প্রেসিডেন্টের বিস্তৃত অর্থনৈতিক নীতির পূর্ণ প্রভাব সম্পর্কে অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগে দ্বিধা দেখা দিয়েছে। শ্রম অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা গেছে জুন ও আগস্টে চাকরি কমেছে এবং সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে গড়ে চাকরি বৃদ্ধি ছিল মাত্র প্রায় ৬২ হাজার।
এর বিপরীতে শ্রম উৎপাদনশীলতা এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। একদিকে অর্থনীতি বিস্তৃত হচ্ছে, অন্যদিকে শ্রমবাজার দুর্বলতার লক্ষণ দেখাচ্ছে যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
অক্টোবরে অনুষ্ঠিত বৈঠকের বিবরণী অনুযায়ী ফেড কর্মকর্তারা মন্তব্য করেছেন যে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি এবং দুর্বল চাকরি বৃদ্ধির এই বিভেদ নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়াকে কঠিন করে তুলছে।
ভোক্তাদের স্থিতিশীল ব্যয় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিপুল বিনিয়োগের ফলে অর্থনীতি শক্তিশালী থাকলেও প্রত্যাশামতো নিয়োগ বাড়ছে না। এমনকি ধারাবাহিক সুদ কমানোর পরও নিয়োগে ইতিবাচক সাড়া দেখা যাচ্ছে না। বিশ্লেষকদের শঙ্কা, আগামী বছর এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হতে পারে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিক্সের প্রধান মার্কিন অর্থনীতিবিদ সিএনএনকে জানান, আগামী বছরে নীতির প্রধান আলোচ্য বিষয় হতে পারে নিয়োগ ছাড়া প্রবৃদ্ধি কীভাবে সামলানো হবে এবং কীভাবে ব্যবসাগুলোকে বেশি কর্মী নিয়োগে উৎসাহ দেওয়া যাবে।
স্টক মার্কেটের সাম্প্রতিক রেকর্ড উচ্চতা ইঙ্গিত দেয় যে অনেক মার্কিন ব্যবসা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মূল্য সম্পর্কে আশাবাদী। তবে সেই আত্মবিশ্বাস এখনো কর্মীসংখ্যা বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়নি। বাণিজ্য বিভাগ জানিয়েছে দ্বিতীয় প্রান্তিকে তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জাম ও সফটওয়্যারে ব্যয় জিডিপির ৪.৪ শতাংশ ছিল যা ২০০০ সালের ডটকম যুগের শীর্ষ সময়ের সামান্য নিচে।
একজন শীর্ষ অর্থনীতিবিদ জানান, প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে, আর এর অর্থ অনেক সময় নিয়োগসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় কমানো। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ তৃতীয় প্রান্তিকেও শক্ত অবস্থানে ছিল এবং আগামী বছরে এ খাতের ব্যয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারি কার্যক্রম বন্ধ থাকার প্রভাব জিডিপিতে পড়তে পারে, তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন আগামী বছরের শুরুতে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
অন্যদিকে বছরের শুরু থেকে বাস্তবায়িত বড় নীতিগত পরিবর্তন শ্রমবাজারকে চাপের মুখে ফেলেছে। বাণিজ্যনীতি ও অভিবাসননীতি সরবরাহ ও চাহিদা উভয় ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, যা কর্মসংস্থানে প্রভাব ফেলছে বলে একজন গবেষণা পরিচালক জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুদের হার কমানো এই নীতিগত পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কতটা সামাল দিতে পারবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ইতিবাচক দিক হলো ব্যাপক ছাঁটাই এখনো দেখা যাচ্ছে না, যা পরিস্থিতি আরও খারাপ করতে পারত।
ফেডের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৬ সাল পর্যন্ত আরও কিছু সুদ কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে নিয়োগবিহীন প্রবৃদ্ধি অর্থনীতিকে দ্রুত ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে। শ্রমবাজার দুর্বল হলে যেকোনো ক্ষুদ্র বিপর্যয়ও মন্দার দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। একজন শীর্ষ কর্মকর্তা সাম্প্রতিক ভাষণে মন্তব্য করেছেন যে জিডিপি এবং চাকরিবৃদ্ধির মধ্যে অমিল একটি সংঘাতের মতো এবং শেষ পর্যন্ত দুইয়ের একটি দিক ভেঙে পড়তে পারে। হয় প্রবৃদ্ধি শ্রমবাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে নেমে আসবে, নয়তো শ্রমবাজার উন্নতি দেখাবে।
যদি চাকরিবৃদ্ধি জিডিপির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না থাকে তবে অর্থনীতি একটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে যেতে পারে। প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী থাকলে আরও সুদ কমানো নিয়ে ফেডের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়। ডালাস ফেডের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে এখন পর্যন্ত দুটি সুদ কমানো হয়েছে, কিন্তু ডিসেম্বর মাসে আরও কমানোর যৌক্তিকতা তিনি এখনই দেখছেন না যদি না মুদ্রাস্ফীতি বা শ্রমবাজারে স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যায়।



