সুইজারল্যান্ডভিত্তিক এক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এমন এক নতুন ধরনের কৃত্রিম “ব্রেন” তৈরি করছে, যা মানবাকৃতি রোবটকে পূর্ব প্রশিক্ষণ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের কাজ সঠিকভাবে সম্পাদন করতে সক্ষম করবে। প্রতিষ্ঠানটি রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং এবং সিম–টু–রিয়াল প্ল্যাটফর্ম উন্নয়ন করছে, যা ভিন্ন ভিন্ন আকৃতি ও কাঠামোর রোবটে প্রয়োগ করা যাবে এবং বহুমাত্রিক কাজ পরিচালনায় সাহায্য করবে।
প্রতিষ্ঠানটির তৈরি অটোনমি স্ট্যাক ভবিষ্যতের রোবটকে আরও অভিযোজনযোগ্য ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় রূপান্তর করবে। পুরো স্ট্যাকটি মূলত চারটি স্তরে বিভক্ত — কমান্ড লেয়ার, মোশন লেয়ার, কন্ট্রোল লেয়ার এবং ইন্টেলিজেন্ট লেয়ার। প্রতিটি স্তরই রোবটকে বাস্তব পরিবেশে মানুষের ন্যূনতম সম্পৃক্ততায় কাজ করার যোগ্যতা প্রদান করবে। প্রতিষ্ঠানের ভাষ্য অনুযায়ী, এখানে নেই কোনো স্ক্রিপ্ট, নেই রিমোট অপারেটরের প্রয়োজন, নেই কাজভেদে দুর্বল লজিক। বরং এমন সিস্টেম তৈরি করা হচ্ছে, যা নিজে থেকেই শিখবে এবং অভিযোজিত হবে।
পরিবেশ বোঝার ক্ষমতা বাড়াবে কমান্ড লেয়ার
এই অটোনমি স্ট্যাকের কমান্ড লেয়ারটি একটি ভাষাভিত্তিক মডেল, যা স্বাভাবিক ভাষায় বর্ণিত কাজকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে এবং কাজটি সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশগত ধারণা তৈরি করে। এটি সাধারণ জ্ঞানভিত্তিক যুক্তি ব্যবহার করে রোবটকে সঠিক নির্দেশনা দেয়।
মোশন লেয়ারটি মূলত ভিশন–ল্যাঙ্গুয়েজ–অ্যাকশন মডেলের ওপর নির্ভরশীল। এটি প্রধানত সিনথেটিক ডেটায় প্রশিক্ষিত, তবে বাস্তব বিশ্বের জটিল পরিস্থিতির জন্য আলাদাভাবে ফাইন–টিউন করা হয়েছে। অন্যদিকে কন্ট্রোল লেয়ারটি ট্রান্সফরমারভিত্তিক, কম লেটেন্সির একটি পূর্ণদেহ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, যেখানে রয়েছে মডুলার স্কিল লাইব্রেরি। এর মাধ্যমে রোবট খুব দ্রুত নতুন আচরণ বা কার্যকলাপ শিখে নিতে পারে।
পরিবেশের সঙ্গে দ্রুত অভিযোজিত প্রতিক্রিয়া
ইউটিউবে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক ভিডিওতে দেখা যায়, রোবটটি তার সামনে উপস্থিত পরিবেশ অনুযায়ী মুহূর্তেই প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম। প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ উদ্দেশ্যভিত্তিক অটোনমি স্ট্যাকের কারণে রোবট নিজে থেকেই ভাবতে পারে এবং সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটি দাবি করছে, বিশ্বের বিভিন্ন মানবাকৃতি রোবট বাহ্যিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের বাইরে গিয়ে কার্যকর বা স্কেলযোগ্য কাজ করতে পারে খুব কমই। সমস্যাটা যন্ত্রের কাঠামো নয়, বরং বুদ্ধিমত্তার অভাব। প্রতিষ্ঠানটি সেই বুদ্ধিমত্তা স্তরটি গড়ে তুলছে, যা রোবটকে সম্পূর্ণ সক্ষম, অভিযোজনযোগ্য এবং স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমে রূপান্তর করবে।
এআই মডেল তৈরির জন্য যে কম্পিউটিং শক্তি ও প্রশিক্ষণ কাঠামো প্রয়োজন, সেটিই এখন রোবটিক্সকে নতুন এক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যাগত পরিবর্তন এবং শ্রম ঘাটতি শিল্প উৎপাদনে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। ২০৫০ সালের মধ্যে উন্নত বিশ্বের এক–তৃতীয়াংশ মানুষ ৬০ বছরের বেশি বয়সে পৌঁছাবে এবং শ্রমবাজারে এই চাপ আরও বাড়বে। তাই প্রতিষ্ঠানের মতে, মানবাকৃতি রোবট এখন আর সায়েন্স ফিকশনের কল্পনা নয়, বরং এক অর্থনৈতিক প্রয়োজন।
নতুন ফান্ডিংয়ে সম্প্রসারণ পরিকল্পনা
এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তারা ৫০ মিলিয়ন ডলার সিরিজ–এ ফান্ডিং পেয়েছে, যাতে যুক্ত হয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান। এর আগে তারা ৭.৩৫ মিলিয়ন ডলার সিড ফান্ড সংগ্রহ করেছিল। নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে জুরিখে গবেষণা ও উন্নয়ন দলকে আরও শক্তিশালী করা, কম্পিউটিং ক্ষমতা বৃদ্ধি, রোবট বহর সম্প্রসারণ, যুক্তরাষ্ট্রে কার্যক্রম শুরু এবং অটোনমি স্ট্যাকের বাণিজ্যিকীকরণ ত্বরান্বিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বড় বড় ওইএম প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চলমান কাজও আরও বিস্তৃত হবে।
প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য, ভবিষ্যতে মানবাকৃতি রোবট যেন মানুষের ওপর নির্ভর না করে, বরং মানুষের সঙ্গে কাজ করতে পারে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে।



