ভেনেজুয়েলা কয়েক মাস ধরে যেন বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্যারিবীয় সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক নৌ মহড়া, হোয়াইট হাউস থেকে কঠোর সতর্কবার্তা এবং প্রেসিডেন্ট মাদুরোর যুদ্ধপ্রস্তুতি দেশের পরিস্থিতিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে প্রতিটি দিনই উত্তেজনার নতুন মাত্রা তৈরি করছে। অনেকে বলছেন, দেশটি যেন এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে সামান্য উত্তেজনাও বড় ধরনের বিপদের কারণ হতে পারে।
এই মুহূর্তে ভেনেজুয়েলা শুধু একটি রাষ্ট্র নয়, বরং পুরো লাতিন আমেরিকার ভবিষ্যতের চিত্র। এখানকার রাজনৈতিক রূপান্তর কিউবা, নিকারাগুয়া, বলিভিয়া এবং আশপাশের বহু দেশের ওপর প্রভাব ফেলবে। তাই সকলের মনে প্রশ্ন, শেষ পর্যন্ত কী ঘটবে। রাষ্ট্রপ্রধান কি ক্ষমতায় টিকে যেতে পারবেন, নাকি তাঁর পতন অনিবার্য হয়ে উঠবে।
কিন্তু যে দিকেই ক্ষমতার পালা ঘুরুক, সাধারণ মানুষের জীবন খুব একটা বদলাচ্ছে না। দীর্ঘ সময় ধরে চলা অর্থনৈতিক ধস মূল্যস্ফীতিকে ২৫০ থেকে ৩০০ শতাংশের মধ্যে রেখেছে। সরকারি তথ্য এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার পরিসংখ্যানে এই চিত্রই ফুটে ওঠে। মধ্যবিত্ত, চাকরিজীবী আর বিশেষত সরকারি কর্মচারীদের জীবনে টানাপোড়েন এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। একজন সরকারি স্কুলশিক্ষকের মাসিক আয় মাত্র ১০ থেকে ১২ ডলারের মতো, যা দিয়ে ন্যূনতম প্রয়োজনই মেটানো যায় না। প্রায় ৯ লাখ ১৬ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দেশে বাস করেন প্রায় ৩ কোটি নাগরিক।
চাভেজের মৃত্যুর পর ২০১৩ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে রাষ্ট্রপ্রধান ক্ষমতায় আসেন। সর্বশেষ নির্বাচন হয় ২০২৪ সালের জুলাইয়ে। বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, তাঁদের প্রার্থী এদমুন্দো গোনসালেস বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন কিন্তু সরকারি পক্ষ নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তৃতীয় মেয়াদের শপথ নেয়। তারপর থেকেই বিক্ষোভ, গ্রেপ্তার ও সহিংসতা রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। এখনো ১৮০০-এর বেশি রাজনৈতিক বন্দী বিভিন্ন কারাগারে আটক।
একই সময়ে বিরোধী শিবিরের অন্যতম নেতা শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃতি বাড়লেও সরকারি পক্ষ এটিকে বিদেশি ষড়যন্ত্র বলে আখ্যা দিচ্ছে।
রাষ্ট্রপ্রধানের রাজনৈতিক উত্থান চাভেজ যুগ থেকেই শুরু। একজন ট্রেড ইউনিয়ন নেতার পরিচয় থেকে তিনি ধীরে ধীরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পরে ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন। চাভেজের কঠিন সময়গুলোতে তাঁর পাশে থাকায় তিনি রাজনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী ছিলেন। তবে ক্যারিশমা এবং জনপ্রিয়তার দিক থেকে তাঁদের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। চাভেজের নাম ছিল লক্ষ মানুষের আবেগের কেন্দ্র, অথচ বর্তমান প্রেসিডেন্ট সেই প্রভাব ধরে রাখতে পারেননি। তা সত্ত্বেও চাভেজের আদর্শকে সামনে রেখে তিনি এখনো জনসমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নীতি লাতিন আমেরিকার ভূরাজনীতিকে আরও অস্থির করেছে। অভিবাসন প্রতিরোধ, মাদক পাচার মোকাবিলা এবং চীনের প্রভাব সীমিত রাখার লক্ষ্যেই ট্রাম্প প্রশাসন নানামুখী চাপ প্রয়োগ করছে। মেক্সিকো ও কলম্বিয়ার ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপ, ক্যারিবীয় সাগরে নৌ মহড়া এবং ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে সামরিক উপস্থিতি মূলত রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। আর এর ফলে অঞ্চলের কয়েকটি দেশে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব আরও তীব্র হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারির তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে। দেশের বিশাল তেলভান্ডার, অভিবাসন সঙ্কট এবং প্রথম মেয়াদে রাষ্ট্রপ্রধানকে সরাতে ব্যর্থ হওয়ার অভিজ্ঞতা। প্রায় ৭৮ লাখ ভেনেজুয়েলান দেশ ছাড়ায় এই সংকট মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।
ক্যারিবীয় সাগরে সাম্প্রতিক মহড়া নিয়ে বিতর্ক চলছে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে এটি মাদকবিরোধী অভিযান হলেও সামরিক বিশ্লেষকেরা বলেছেন, এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার, ড্রোন, নজরদারি বিমান এবং বৃহৎ সেনা উপস্থিতি সাধারণ অভিযানে দেখা যায় না। ভেনেজুয়েলার উপকূলের এত কাছে এ ধরনের মহড়া পরিস্থিতিকে স্পর্শকাতর করে তুলেছে। পাল্টা হিসেবে দেশটির সেনাবাহিনীও বিপুলসংখ্যক সৈন্য মোতায়েন করেছে। এই শক্তি প্রদর্শনের ফলে যেকোনো ভুল বোঝাবুঝি বড় ধরনের সংঘর্ষের পথ খুলে দিতে পারে।
তবে রাষ্ট্রপ্রধান এখনো তিনটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছেন। প্রথমত, দেশের সামরিক নেতৃত্ব তাঁর প্রতি অনুগত। তাঁদের আর্থিক স্বার্থ, বিভিন্ন অবৈধ অর্থচক্রের নিয়ন্ত্রণ এবং শক্তিশালী প্রভাবমণ্ডল তাঁদের সরকারি অবস্থানের প্রতি অনুগত রাখছে। দ্বিতীয়ত, রাশিয়া, ইরান, চীন এবং কিউবার মতো মিত্র দেশগুলোর সমর্থন। তৃতীয়ত, দেশের একাংশ এখনো বিশ্বাস করে যে বিদেশি হস্তক্ষেপ ভেনেজুয়েলাকে আরও অস্থিতিশীল করবে।
ব্রাজিল, কলম্বিয়া এবং মেক্সিকো ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান নিলেও তাঁরা শান্তিপূর্ণ সমাধানের ওপরই জোর দিচ্ছেন। কেউ সরাসরি সমর্থন না দিলেও কূটনৈতিক সমাধানের গুরুত্ব তুলে ধরছেন।
অন্যদিকে বিরোধী শিবির নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর নতুন উদ্দীপনা পেলেও নেতৃত্বের বিভাজন এখনো তাদের বড় দুর্বলতা। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও তাঁরা এখনো কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে পারছেন না।
সব মিলিয়ে ভেনেজুয়েলা এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে যেখানে কোনো সিদ্ধান্তই সহজ নয়। রাষ্ট্রপ্রধান ক্ষমতায় থাকলে দেশ আরও বিচ্ছিন্ন হতে পারে, আর তাঁর পতন ঘটলে রাজনৈতিক শূন্যতার ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। এই অনিশ্চয়তার ভার সবচেয়ে বেশি বহন করছে সাধারণ মানুষ।



