পৃথিবীর সীমা অতিক্রম করে মহাকাশে ডেটা সেন্টার স্থাপনের এক ব্যতিক্রমী পরিকল্পনা সামনে এনেছে ইলন মাস্কের মালিকানাধীন মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সৌরশক্তিচালিত বিপুলসংখ্যক স্যাটেলাইটের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ডেটা সেন্টার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতের এআই কম্পিউটিং অবকাঠামো একটি নতুন দিগন্তে পৌঁছাবে।
স্পেসএক্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রস্তাবিত ডেটা সেন্টারগুলো পৃথিবীর কক্ষপথে অবস্থান করবে এবং পুরোপুরি সৌরশক্তির ওপর নির্ভরশীল হবে। এ লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশনের কাছে সর্বোচ্চ ১০ লাখ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের অনুমোদন চেয়ে আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। আবেদন অনুযায়ী, এসব স্যাটেলাইট পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে মহাকাশভিত্তিক একটি বৃহৎ ডেটা প্রসেসিং নেটওয়ার্ক গড়ে তুলবে, যা এআই প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এফসিসিতে দাখিল করা নথিতে স্পেসএক্স উল্লেখ করেছে, পৃথিবীতে স্থাপিত প্রচলিত ডেটা সেন্টারগুলোর তুলনায় মহাকাশে সৌরশক্তির প্রাপ্যতা অনেক বেশি ও স্থিতিশীল। ফলে শক্তি উৎপাদন ও ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি, ভবিষ্যতে এআই কম্পিউটিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল পরিমাণ শক্তি ও অবকাঠামোর চাপ পৃথিবীর ওপর থেকে কিছুটা হলেও কমবে বলে আশা করছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগ প্রযুক্তিগত উন্নয়নের একটি নতুন অধ্যায় সূচনা করতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞ মহলে এই পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন ও উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পৃথিবীর কক্ষপথে প্রায় ১৫ হাজার স্যাটেলাইট সক্রিয় রয়েছে। এরই মধ্যে মহাকাশে ধ্বংসাবশেষ ও দূষণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্যাটেলাইটের সংখ্যা আরও বাড়লে সংঘর্ষের সম্ভাবনা ও মহাকাশ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। ফলে স্পেসএক্সের প্রস্তাবিত বিপুলসংখ্যক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ ভবিষ্যতে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে।
এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব স্যাটেলাইট প্রকল্প বাস্তবায়নে ভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার কথা জানিয়েছে। উৎক্ষেপণযানের স্বল্পতার কারণে তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এক হাজার ছয়শটির বেশি স্যাটেলাইট কক্ষপথে পাঠাতে পারছে না। এ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে সময়সীমা বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, মহাকাশে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ এখনো প্রযুক্তিগত ও লজিস্টিক দিক থেকে বড় চ্যালেঞ্জের বিষয়।
প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম দ্য ভার্জের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একসঙ্গে ১০ লাখ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের অনুমোদন পাওয়া বাস্তবসম্মত নয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, স্পেসএক্সের এই প্রস্তাব মূলত এফসিসির সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা শুরুর একটি কৌশল হতে পারে। কারণ, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটিকে অতিরিক্ত সাত হাজার পাঁচশটি স্টারলিংক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের অনুমতি দিলেও প্রস্তাবিত আরও চৌদ্দ হাজার নয়শ আটাশি স্যাটেলাইটের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, মহাকাশভিত্তিক ডেটা সেন্টার ধারণাটি প্রযুক্তিগতভাবে আকর্ষণীয় হলেও এর বাস্তবায়ন বহুস্তরীয় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। অনুমোদন প্রক্রিয়া, মহাকাশ নিরাপত্তা, পরিবেশগত প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক নীতিমালার বিষয়গুলো এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তবুও স্পেসএক্সের এই উদ্যোগ দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ভবিষ্যতের ডেটা সংরক্ষণ ও এআই কম্পিউটিং শুধু পৃথিবীতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং মহাকাশও হতে পারে নতুন প্রযুক্তিগত কেন্দ্র।



