মধ্য বয়সে ব্যায়ামেই কমে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি

বিশ্বজুড়ে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন একটি গবেষণা জানিয়েছে যে বয়স বাড়ার পরও নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম মস্তিষ্কের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষত ৪৫ বছর বা তার বেশি বয়সে ব্যায়ামের অভ্যাস ঝুঁকি কমাতে বিশেষ কার্যকর হতে পারে।

সম্প্রতি জার্নাল জেএএমএ নেটওয়ার্ক ওপেনে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, মধ্য বয়স এবং পরবর্তী বয়সে যারা সর্বোচ্চ মাত্রায় শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকেন, তাদের ডিমেনশিয়া হওয়ার ঝুঁকি যথাক্রমে ৪১ শতাংশ এবং ৪৫ শতাংশ কম। গবেষণায় ৪৫ থেকে ৬৪ বছরকে মধ্য বয়স এবং ৬৫ থেকে ৮৮ বছরকে পরবর্তী বয়স ধরা হয়েছে।

হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের একজন নিউরোলজি বিশেষজ্ঞ, যিনি গবেষণায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন না, মন্তব্য করেন যে এই গবেষণা আলোচনাকে নতুন দিক দিয়েছে। তার ভাষায়, আগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ব্যায়াম মস্তিষ্কের জন্য উপকারী কিনা, এখন গবেষণাটি বলছে জীবনের নির্দিষ্ট সময়ে ব্যায়াম আরও বেশি কার্যকর হতে পারে।

গবেষণার প্রধান লেখক, বোস্টন ইউনিভার্সিটির একজন এপিডেমিওলজি বিশেষজ্ঞ, জানান যে বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৫৭ মিলিয়ন মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত এবং ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা তিনগুণ বাড়তে পারে। তাই তারা জানতে চেয়েছিলেন প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে শারীরিক কার্যক্রম ডিমেনশিয়ার ঝুঁকিতে একই প্রভাব ফেলে কিনা বা ভিন্ন প্রভাব রয়েছে কিনা।

যদিও গবেষণাটি শারীরিক ব্যায়ামের নির্দিষ্ট পরিমাণ জানায়নি, কারণ তারা ঘুম, বসে থাকা, হালকা থেকে ভারী কার্যক্রম মিলিয়ে একটি সমন্বিত পরিমাপ ব্যবহার করেছে, তবে গবেষকের মতে বেশি হাঁটা, চলাফেরা করা এবং শারীরিক কাজ বৃদ্ধি করা অবশ্যই উপকারী।

২০২২ সালের আরেকটি গবেষণা বলছে, দিনে মাত্র ৩৮০০ পদক্ষেপ হাঁটলেও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি ২৫ শতাংশ কমে। আবার পরিবহন ব্যবস্থায় গাড়ির বদলে সাইকেল ব্যবহার করলে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি ১৯ শতাংশ এবং অ্যালঝাইমার রোগের ঝুঁকি ২২ শতাংশ কমতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে ১৫০ থেকে ৩০০ মিনিট মাঝারি মাত্রার অ্যারোবিক কার্যক্রম বা ৭৫ থেকে ১৫০ মিনিট উচ্চমাত্রার অ্যারোবিক ব্যায়াম করা উচিত। এতে দ্রুত হাঁটা, জোরে দৌড়ানো, সাইক্লিং এবং সপ্তাহে দুদিন শক্তিবর্ধক ব্যায়াম অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের মূল্যায়নের জন্য একটি ২১ পয়েন্টের স্কোরিং ব্যবস্থা প্রস্তুত করা হয়েছে, যার সহ-উদ্ভাবকদের একজন জানান যে জীবনযাপন এবং সামাজিক ও মানসিক অভ্যাসসহ বিভিন্ন বিষয় মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন করে ব্যায়াম শুরু করতে চাইলে বিশেষজ্ঞরা হঠাৎ কঠিন বা দীর্ঘ ব্যায়াম না করে ধীরে ধীরে অভ্যাস গড়ে তুলতে বলেন। অতিরিক্ত চাপ দিলে শারীরিক আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা ভবিষ্যতে ব্যায়াম চালিয়ে যেতে বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। প্রতিদিন সকালে ২০ মিনিট হাঁটা বা দুপুরে ছোট একটি বিরতিতে নড়াচড়া করার মতো অভ্যাস তৈরি করতে পারেন।

গবেষণাটি দীর্ঘমেয়াদি ফ্রেমিংহ্যাম হার্ট স্টাডির অন্তর্ভুক্ত তিনটি বয়সভিত্তিক দলের ওপর পরিচালিত হয়েছে। এতে দেখা গেছে, তরুণ বয়সে শারীরিক কার্যক্রম ডিমেনশিয়ার ঝুঁকিতে বিশেষ প্রভাব ফেলে না। তবে বয়স্কদের মধ্যে যাদের অ্যালঝাইমার রোগের উচ্চ জিনগত ঝুঁকি রয়েছে, তারাও বেশি সক্রিয় থাকলে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি ৬৬ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারেন।

তবে গবেষকদের মতে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। যারা বেশি সক্রিয় তারা সাধারণত অন্যান্য ভালো অভ্যাস অনুসরণ করেন, যা আলাদা প্রভাব ফেলতে পারে। আবার অংশগ্রহণকারীরা নিজের কার্যক্রমের মাত্রা সঠিকভাবে না-ও মনে রাখতে পারেন। তাই ভবিষ্যতে ওয়্যারেবল ডিভাইস ব্যবহার করে আরও নির্ভুল গবেষণা হওয়া উচিত।

মধ্য এবং পরবর্তী বয়সে ব্যায়ামের বিশেষ প্রভাবের কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সময়ে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা কোলেস্টেরলের মতো ঝুঁকি বাড়ে, আর ব্যায়াম এগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি ব্যায়াম মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যকারিতা উন্নত করে, প্রদাহ কমায় এবং অ্যালঝাইমারের সঙ্গে যুক্ত বেটা অ্যামিলয়েড প্রোটিনের মাত্রা হ্রাস করতে পারে।

ডিমেনশিয়া প্রতিরোধে ব্যায়াম, সুষম জীবনযাপন এবং নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed