শুক্রবারের ভূমিকম্পে প্রচণ্ড দোলনে কেঁপে ওঠে পুরো ঢাকা শহর। আতঙ্কের সেই মুহূর্তে অনেকেই জীবন বাঁচাতে ছুটে যান নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে। আবার কেউ কেউ ছিলেন এমন জায়গায়, যেখানে পালানোর সুযোগ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও সেই মুহূর্তগুলোর বিবরণ, ভিডিও ফুটেজ এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় এখন ভরপুর। এর মধ্যেই রাজধানীর এক হাসপাতালে একজন চিকিৎসক ও দুজন নার্স নিজেদের নিরাপত্তা ভুলে নবজাতকদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য ভাইরাল হয়ে ওঠে।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, চারপাশ কাঁপতে শুরু করলে হাসপাতালের শিশু বিভাগে চিকিৎসকের পদে থাকা একজন কর্মকর্তা দুই হাত দিয়ে একটি নবজাতককে ধরে রাখেন। সঙ্গে থাকা নার্সদের একজন দ্রুত আরেক নবজাতকের কাছে ছুটে যান। ঘটনা রাজধানীর শ্যামলীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের।
শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার যে ভূমিকম্প অনুভূত হয়, তা সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে তীব্র কম্পন বলে মন্তব্য করেছেন ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা। এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদী। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস এটি ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী কমলা শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করে, যার অর্থ উল্লেখযোগ্য প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে। যদিও বড় ক্ষতি হয়নি, তবু শক্তিশালী কম্পনে ঢাকার মানুষ আতঙ্কে কেঁপে ওঠে। চিকিৎসকের পদে থাকা ওই কর্মকর্তা নিজেও ভয় পেয়েছিলেন, কিন্তু দায়িত্বকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ওপরে স্থান দেন।
শনিবার বিকেলে তাঁর সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, সেদিন তিনি এবং তাঁর সঙ্গে থাকা দুই নার্স যা করেছিলেন, তা দায়িত্বশীল অবস্থানে থাকা বেশির ভাগ চিকিৎসকেরই করণীয় ছিল। তিনি জানান, ফুটেজটি হাসপাতাল থেকে পেয়ে সেটি ফেসবুকে শেয়ার করেছিলেন। এরপর থেকে তিনি অসংখ্য মানুষের শুভকামনা পাচ্ছেন।
তিনি বলেন, ভূমিকম্পের মুহূর্তে তাঁর মনে হয়েছিল নিজের জীবন গেলেও নবজাতকরা যেন নিরাপদ থাকে। শিশুবিভাগের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে সে সময় তিনটি নবজাতক এবং চার বছরের কম বয়সী চারটি শিশু ছিল। তিনি যে নবজাতকটিকে ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন হাসপাতালের নথিতে তার নাম রয়েছে মায়ের নাম অনুসারে। মাত্র সাত দিনের ওই শিশুর জন্মের পর থেকেই কান্না না করা, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি সহ নানা জটিলতা ছিল।
তার মোবাইলে ভূমিকম্পের আগাম সতর্কতার অ্যাপ ছিল। তিনি জানান, কম্পন শুরুর দুই তিন সেকেন্ড আগে অ্যালার্ম বাজে। তিনি দাঁড়িয়ে যান এবং কম্পন বাড়লে হাত দিয়ে নবজাতকটিকে আঁকড়ে ধরেন। দায়িত্বে থাকা নার্সদের দুজনও দ্রুত অন্য নবজাতকদের সুরক্ষায় এগিয়ে যান।
তিনি বলেন, সেই সময় নিজের মৃত্যুর চিন্তা মাথায় আসেনি। শুধু ভেবেছেন নবজাতকদের ওপর কিছু পড়ে যেতে পারে। কম্পন থামার পর তিনি দুই নার্সকে ধন্যবাদ জানিয়ে ট্রিট দেন।
হাসপাতালের ব্যবস্থাপকের কাছ থেকে ফুটেজটি পেয়ে তিনি সেটি ফেসবুকে শেয়ার করেন। পোস্টটি ভাইরাল হওয়ার পর বহু মানুষ মন্তব্য, শেয়ার এবং ফোন কলের মাধ্যমে তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তিনি জানান, ভূমিকম্পের পর পরিবারের সদস্যরা বাসায় যেতে বললেও তিনি বলেন মৃত্যুর সম্ভাবনা যেকোনো জায়গাতেই থাকে।
ভূমিকম্পের পর শিশুদের অভিভাবকেরা আতঙ্কে হাসপাতালে ছুটে আসেন। সাধারণত নির্দিষ্ট সময় ছাড়া ভেতরে প্রবেশ করা না গেলেও সেদিন অভিভাবকদের গাউন পরিয়ে সন্তানের কাছে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় এবং একটু বেশি সময় ভেতরে থাকার অনুমতিও দেওয়া হয়। কেউ কেউ সন্তানকে বাসায় নিতে চাইলে তাঁদের কাউন্সেলিং করতে হয়।
ঘটনার পর তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে যারা দায়িত্বে ছিলেন, সবারই প্রশংসা প্রাপ্য। কারণ স্বাস্থ্যসেবার কাজ শুধু পেশা নয়, এটি প্রতিশ্রুতি।



