বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের বাস্তবতা আর শুধু একটি দেশ বা অঞ্চলের সংকট নয়, এটি এখন আন্তর্জাতিক মাত্রার এক জরুরি অবস্থা। সুইজারল্যান্ডের ধনী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে স্বর্ণের বার ও বিলাসবহুল ঘড়ি গ্রহণের পর যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্টের প্রশাসনে শুল্ক কমানোর ঘটনা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। অর্থনৈতিক শক্তির অতিরিক্ত একচ্ছত্রতা যে নীতি নির্ধারণকে প্রভাবিত করতে পারে, সেই উদ্বেগই সামনে এনে দেয় সাম্প্রতিক বৈশ্বিক আলোচনা। ঠিক এমন সময় নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদের নতুন বিশ্লেষণ বৈষম্যকে মানবসৃষ্ট মহাবিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত করে সতর্কবার্তা দিচ্ছে। তার মতে এই বৈষম্য রাজনীতি, সমাজ এবং পরিবেশের ভারসাম্যকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, বিশ্বের নব্বই শতাংশ মানুষ এখন উচ্চমাত্রার বৈষম্যের আওতায় বসবাস করছে। উন্নত দেশগুলোর ভেতরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। জি সেভেনের মধ্যে সবচেয়ে বৈষম্যময় রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে চিহ্নিত করা হয়েছে, এর পরেই যুক্তরাজ্যের অবস্থান। নোবেলজয়ী এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন যে বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর স্থিতি রক্ষাকারীরা আর এই অনিয়ম ও বৈপরীত্যগুলোর ব্যাখ্যা দিতে পারছে না। এজন্য তিনি বিদ্যমান ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন নীতিগত কাঠামো প্রস্তাব করছেন, যার খসড়া তুলে ধরা হয়েছে জি টোয়েন্টির প্রথম অসমতা বিষয়ক প্রতিবেদনে। এতে যুক্ত হয়েছে ইউরোপ, আফ্রিকা এবং মধ্যম আয়ের দেশের গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন।
প্রতিবেদনের তথ্য আরও উদ্বেগ বাড়ায়। ২০০০ সাল থেকে বৈশ্বিক নতুন সম্পদের একচল্লিশ শতাংশ অর্জন করেছে বিশ্বের শীর্ষ এক শতাংশ মানুষ। অন্যদিকে নিচের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর অংশীদারিত্ব মাত্র এক শতাংশ। গড় হিসাবে শীর্ষ এক শতাংশের প্রতিজন প্রায় তেরো লাখ মার্কিন ডলার করে সম্পদ বাড়িয়েছে, বিপরীতে দরিদ্র অর্ধেক জনগোষ্ঠীর প্রতিজন বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র পাঁচশো আশি পাঁচ ডলার। একই সময়ে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে প্রায় দুই দশমিক তিন বিলিয়ন মানুষ, যা ২০১৯ সালের তুলনায় তিনশো পঁয়ত্রিশ মিলিয়ন বেশি। বৈশ্বিক সম্পদের এই অতি ঘনত্ব আয় বৈষম্যকেও ছাড়িয়ে গেছে। ধনকুবেরদের মোট সম্পদের পরিমাণ এখন বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় এক ষষ্ঠাংশের সমান এবং তাদের সম্পদ বৃদ্ধি খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার বৃদ্ধির সঙ্গে প্রায় সমান্তরাল গতিতে এগোচ্ছে।
প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে চরম বৈষম্য কোনো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার ফল নয়, বরং তা সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে। আর্থিক নীতিমালার শিথিলতা, শ্রম সুরক্ষার দুর্বলতা, সরকারি খাতের বেসরকারিকরণ, কর্পোরেট ও উচ্চ আয়ের মানুষের জন্য কর কমানো সবই বৈষম্যকে ত্বরান্বিত করেছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রভাবটি রাজনৈতিক। যেখানে বৈষম্য বেশি, সে সব দেশ গণতান্ত্রিক পশ্চাদপদতা বা স্বৈরতান্ত্রিক ঝুঁকিতে সাত গুণ বেশি ভোগে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদের মতে অতিধনী শ্রেণি অসম হারে কার্বন নিঃসরণ ঘটাচ্ছে যা নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি প্রচলিত ধারণা যে বৈষম্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ায় তা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন।
জি টোয়েন্টির প্রতিবেদন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থার যে পুনর্গঠনের প্রস্তাব দেয় তা ১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস ব্যবস্থার মতোই ব্যাপক। সেই সময় বৈশ্বিক সংকট নতুন অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার প্রয়োজন তৈরি করেছিল। আজও একই ধরনের অস্থিরতা, সংকট ও বৈষম্য নতুন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে। এজন্য প্রস্তাব রাখা হয়েছে মেধাস্বত্ব আইন পুনর্বিবেচনা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি সংশোধন, বৈশ্বিক অর্থদাতাদের সংস্কার, এবং আন্তর্জাতিক করব্যবস্থা ও সার্বভৌম ঋণনীতি হালনাগাদ করার।
একটি ন্যায্য বৈশ্বিক ব্যবস্থার সূচনা হওয়া উচিত জ্ঞান, পর্যালোচনা এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত দিয়ে। জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় যেমন আন্তঃসরকার প্যানেল বৈজ্ঞানিক ঐকমত্যকে বৈশ্বিক মর্যাদা এনে দিয়েছিল, তেমনই এখন প্রয়োজন আন্তর্জাতিক বৈষম্য বিষয়ক একটি প্যানেল। বহু বিশেষজ্ঞ এতে সমর্থন জানিয়েছেন। এমন একটি কাঠামো অনুমোদন করা কোনোভাবেই চরমপন্থী সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি যুক্তিসংগত ভবিষ্যতের প্রথম ধাপ। তা না হলে নীতিনির্ধারণে স্বর্ণের বার ও বিলাসপণ্যের প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা আরও বিস্তৃত হবে।



