বিশ্বব্যাপী অর্থবাজারের ওপর ক্রিপ্টোকারেন্সির তীব্র প্রভাব আবারও সামনে এসেছে সাম্প্রতিক ধসের ঘটনায়। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত বাজার থেকে আলাদা একটি জগৎ হিসেবে বিবেচিত হলেও, এবার ক্রিপ্টো বাজার দেখিয়ে দিল—এই ক্ষেত্রের ফাটল বিশ্বের আর্থিক স্থিতির উপর কত দ্রুত এবং কত গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। উদ্ভাবন ও গতির ওপর দাঁড়াানো এই ডিজিটাল অর্থব্যবস্থা প্রতিবারের মতো এবারও প্রমাণ করল যে, নিয়ন্ত্রণহীন ঝুঁকি শেষ পর্যন্ত প্রচলিত ব্যবস্থাকেও নাড়িয়ে দেয়।
চীনের বিরুদ্ধে শতভাগ শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্টের মন্তব্য ১০ অক্টোবর ক্রিপ্টো বাজারে ব্যাপক ধাক্কা আনে। কয়েক মিনিটের মধ্যে বিটকয়েনের দাম ১০ শতাংশের বেশি কমে যায় এবং পুরো ক্রিপ্টো বাজারের মূলধন বিলিয়ন ডলারে গলে যেতে শুরু করে। ধার নেওয়া অর্থ ও অস্থির জামানত দিয়ে লেনদেন করা লাখো ট্রেডার সেই মুহূর্তে ক্ষতি ঠেকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। স্বয়ংচালিত অ্যালগরিদম মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ১৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি পজিশন লিকুইডেট করে দেয়, প্রায় ১৬ লাখ ট্রেডারের অ্যাকাউন্ট শূন্যে নেমে আসে। এই ধস শুধু দিনের খবরই ছিল না—এটি ইঙ্গিত দিল deregulated বা নিয়ন্ত্রণহীন বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ইতিহাসে সঞ্চয় ও ঋণখাতের বিপর্যয় কিংবা সাবপ্রাইম হাউজিং সংকট যেমন ভয়াবহ ক্ষতির জন্ম দিয়েছিল, এবার ক্রিপ্টো বাজারের দুর্বলতা সেই ধরনের আরেক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে।
ধসের প্রথম ঢেউ কয়েক দিনের মধ্যেই কিছুটা থিতিয়ে এলেও বাজারের ভঙ্গুরতা কাটেনি। বিটকয়েন এখনো শীর্ষ অবস্থান থেকে ২০ শতাংশের বেশি নিচে। বড় সংকটের যেসব লক্ষণ অতীতে দেখা গিয়েছিল, তার অনেকটাই এবারও প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত সরকার ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের আর্থিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
ক্রিপ্টো সমর্থকদের সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো—বাজারে উদ্ভাবন আনতে সরকারী নিয়ন্ত্রণের বাধা কমানো দরকার। তবে ইতিহাস বলছে, এমন ভাবনা আগেও বড় বিপর্যয়ের জন্ম দিয়েছে। ৮০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে সঞ্চয় ও ঋণখাতের deregulation–ই শেষ পর্যন্ত বিপুল লোকসানের কারণ হয়েছিল। সুদের হার নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে ছাড়—এসব পরিবর্তন সঞ্চয়খাতকে দুর্বল করে দেয় এবং করদাতাদের টাকায় ক্ষতি পোষাতে হয়।
সাবপ্রাইম হাউজিং বিপর্যয়েও একই চিত্র দেখা যায়। জটিল মর্টগেজ–বন্ড ব্যবস্থার ওপর পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় ব্যাংকগুলো অত্যধিক ঝুঁকি নেয়, আর পরিণতিতে বিশ্বব্যাপী মন্দা দেখা দেয়। তৎকালীন ফেডারেল রিজার্ভ প্রধানও পরে স্বীকার করেছিলেন, বাজারে নিজেদের স্বার্থে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করবে—এমন ধারণায় বড় ভুল ছিল।
সাম্প্রতিক ক্রিপ্টো ধস দেখাচ্ছে, এবারও বাজার ও সরকার একই পথে হাঁটছে—কেবল এইবার পরিণতি আরও ব্যাপক হতে পারে, কারণ ক্রিপ্টো বিশ্বব্যাপী ও ২৪/৭ চলমান একটি বাজার। এই খাত এখনো কার্যত নিয়ন্ত্রণশূন্য। হাজারো ক্রিপ্টো অ্যাসেট ন্যূনতম তদারকি ছাড়াই চলছে, অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত ব্যাংকের চেয়ে বেশি রিটার্ন দেখিয়ে বিনিয়োগ টানছে। যুক্তরাষ্ট্রের করদাতারা এখনো বড় ঝুঁকিতে নেই মনে হলেও, অতীতের উদাহরণ বলছে—বিপর্যয়ের শুরুতে কখনোই ঝুঁকি স্পষ্ট থাকে না।
নিয়ন্ত্রণহীন বাজারে মূল্য–নির্ধারণে কোনো ঐক্য নেই, ফলে কারসাজির অভিযোগ দেখা দেওয়াও স্বাভাবিক। ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্মে যে অস্বচ্ছ লেনদেন হচ্ছে, তা প্রচলিত বাজারে হলে একাধিক সংস্থা তদন্তে নামত। ধসে সন্দেহজনকভাবে বড় মুনাফার ঘটনাও সেই প্রশ্নকে সামনে এনেছে। প্রচলিত বাজারে যেমন সার্কিট ব্রেকার থাকে, ক্রিপ্টোতে নেই। ফলে কয়েক সেকেন্ডেই ব্যাপক লিকুইডেশন শুরু হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
অক্টোবরের ধসে মাত্র কয়েক মিনিটে বড় বড় এক্সচেঞ্জগুলোতে বাজারের গভীরতা ৮০ শতাংশের বেশি কমে যায়। ২.১ বিলিয়ন ডলারের পজিশন স্বয়ংক্রিয়ভাবে লিকুইডেট হয়। যুক্তরাষ্ট্রে বাজার বন্ধ থাকলেও ইউরোপ ও এশিয়ায় ক্রিপ্টো বিনিয়োগকারীদের অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা আবার প্রচলিত বাজারেও চাপ তৈরি করে। এই বৈশ্বিক আন্তঃসংযোগই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
অবশেষে মূল্য পড়ে যাওয়ায় ‘ডিপ বায়ার’রা বাজারে ঢুকে চাপ সামাল দেয় এবং শুল্ক হুমকি প্রত্যাহারের ঘোষণাও পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত করে। কিন্তু দুর্বলতা রয়ে গেছে আগের মতোই। ইউরোপ ও এশিয়ার ব্যাংকগুলো ক্রিপ্টো ঝুঁকি নিয়ে বেশি সতর্ক হলেও ২০২৫ থেকে ইউরোপের নতুন নিয়ন্ত্রণ কাঠামোও সম্পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারবে কি না—সেটি এখনো প্রশ্নসাপেক্ষ। এদিকে এশিয়ায় ক্রিপ্টো বিনিয়োগ দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে এবং বড় পরিবারভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলো এখন এ বাজারে মূল খেলোয়াড়।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বিনিয়োগকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করে থাকে, ফলে ক্রিপ্টো ধসের অভিঘাত সরাসরি শেয়ারবাজারেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে বৈশ্বিক অর্থবাজারে ডোমিনো এফেক্ট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। ভূরাজনীতিও চিত্রকে আরও জটিল করছে, কারণ বিভিন্ন দেশ ক্রিপ্টোকে নিজেদের অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।
অবশেষে অক্টোবরের অস্থিরতা আর্থিক ব্যবস্থা ভেঙে না দিলেও সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে ক্রিপ্টো একটি নতুন যুগের ইঙ্গিত দিলেও বাস্তবতা হলো—অস্বচ্ছ কাঠামো আর অতিরিক্ত ঋণনির্ভর বাজার কখনোই স্থিতিশীলতা এনে দেয় না। ক্রিপ্টো ভবিষ্যতের অর্থব্যবস্থার অংশ হবে নাকি পরবর্তী বড় আর্থিক বিপর্যয়ের সূচনা করবে—তা নির্ভর করছে এখনকার নিয়ন্ত্রণ–সিদ্ধান্তের ওপর।



