সালাদের ইতিহাস শুরু হয়েছিল প্রাচীন রোমানদের হাতে। তারা রোমেইন লেটুস লবণে চুবিয়ে খেত এবং একে বলা হত হেরবে সালাতা, অর্থাৎ লবণযুক্ত পাতা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সাধারণ ধারণাটি বিশ্বের নানা প্রান্তে নানা রঙে, স্বাদে এবং উপাদানে সমৃদ্ধ হয়ে এখন যে বৈচিত্র্যময় খাবারে রূপ নিয়েছে, তা শুধু স্বাদ নয়, একটি অঞ্চলের সংস্কৃতি ও ইতিহাসকেও প্রতিনিধিত্ব করে। কোথাও সালাদ ঠান্ডা খাবার, কোথাও আবার এটি হয়ে ওঠে পূর্ণাঙ্গ একটি ভারী পদ। যে ভাবেই পরিবেশন করা হোক, সালাদের মূল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে তাজা উপাদান, সঠিক টেক্সচার এবং ভারসাম্যপূর্ণ ড্রেসিংয়ে।
ইতালিতে প্যানজানেলা পরিচিত দিনশেষের খাবার হিসেবে। আগের দিনের কড়া হয়ে যাওয়া রুটি, শরি ভিনেগারের ব্রাইনে ভিজে, টমেটো, শসা, সেলারি এবং স্প্রিং অনিয়ন মিশে এমন এক স্বাদ তৈরি করে যা শত বছরের ঐতিহ্য বহন করে। ফ্রান্সে সালাদ নিসোয়াজ জনপ্রিয়, যেখানে মাছ, অলিভ, ক্যাপার, সিদ্ধ ডিম, আলু এবং সবুজ বিন একসঙ্গে সাজিয়ে পরিবেশন করা হয়।
সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়ার বিশেষ উৎসবের খাবার ইউ শেং সৌভাগ্যের প্রতীক। নতুন বছরের আশীর্বাদ কামনায় অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন উপাদান উঁচু করে নেড়ে উদযাপনের অংশ হিসেবে খেয়ে থাকে। ভারতের নারাঙ্গি সালাদে কমলা, মরিচ, গাজর, বাঁধাকপি এবং মধুভিত্তিক টক মিষ্টি ড্রেসিং থাকে, যা গরম আবহাওয়ায় সতেজ অনুভূতি দেয়।
ইসরায়েলে স্যালাত কাযুত্ খুব প্রচলিত। শসা, টমেটো এবং পার্সলে মিশে সহজ একটি সালাদ হলেও এটি দেশজুড়ে প্রতিদিনের খাবারের অংশ। মেক্সিকোর জিকামা সালাদে থাকে মিষ্টি ক্রাঞ্চ, সঙ্গে তাজিনের চিলে-লাইম স্বাদ যা খাবারে বাড়তি প্রাণ যোগ করে।
সুইডেনের প্রেসগুরকা হলো দ্রুত পিকল করা শসা, যা মাংসের ভারী খাবারের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। বুলগেরিয়ার শপস্কা সালাদ, যার রঙ দেশের পতাকার রঙের সঙ্গে মিলে যায়, টমেটো, মরিচ, শসা এবং সাইরেনে চিজ দিয়ে তৈরি। আর্জেন্টিনায় হৃৎপিণ্ডজাত পাম গাছের পালমিতো দিয়ে তৈরি সালাদ জনপ্রিয়।
মিয়ানমারের লাফেত তোকে চায়ের পাতা দিয়ে তৈরি একটি বিশেষ ঐতিহ্যবাহী সালাদ। গরম দুপুরে এটি স্থানীয়দের প্রধান ঠান্ডা করার উপায়। গ্রিসের হোরিয়াতিকি বা ভিলেজ সালাদে থাকে রসালো টমেটো, শসা, পেঁয়াজ, অরেগানো এবং ওপরের দিকে ফেটা চিজ।
স্পেনের পিপিরানা, থাইল্যান্ডের সম তুম, যুক্তরাষ্ট্রের কব সালাদ, লেবাননের তাব্বুলে, জাপানের সুনোমোনো, জার্মানির কার্টোফেলসালাত, ইন্দোনেশিয়ার গাডো গাডো—প্রতিটি সালাদ একটি দেশের স্বাদ, মাটি এবং পরিবেশ অনুসারে গড়ে ওঠা আলাদা এক পরিচয় বহন করে।
ইরানের শিরাজি সালাদ, রাশিয়ার অলিভিয়ে, নিউ ইয়র্কের ওয়ালডর্ফ সালাদ এবং মেক্সিকোতে জন্ম নেওয়া সিজার সালাদও সময়ের সঙ্গে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ইথিওপিয়ার টিমাতিম এবং পূর্ব আফ্রিকার কাচুম্বারি সালাদ সহজ উপাদানে তৈরি হলেও স্বাদের গভীরতায় অনন্য।
এইসব সালাদ শুধুমাত্র খাবার নয়, প্রতিটি একটি গল্প। পুরোনো রেসিপি, স্থানীয় উপাদান, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবি হিসেবে এগুলো আজও বিশ্বজুড়ে টিকে আছে নিজেদের অনন্য স্বাদে।



