বিশ্বজুড়ে সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টারনেট সেবায় ঘন ঘন বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে যা সাধারণ ব্যবহারকারীর দৈনন্দিন কাজও ব্যাহত করছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অচলাবস্থা এখন শুধু বেশি নয় বরং আগের তুলনায় আরও বিস্তৃত হয়ে উঠেছে।
গত মঙ্গলবার একটি শীর্ষস্থানীয় ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে হঠাৎ ত্রুটি দেখা দিলে কয়েক ঘণ্টা ধরে বিভিন্ন জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম থমকে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে চ্যাট প্ল্যাটফর্ম পর্যন্ত বহু সেবা একযোগে অচল হয়ে পড়ে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গত এক মাসের মধ্যে এটি ছিল তৃতীয় বড় ইন্টারনেট বিপর্যয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত জনপ্রিয় ডিজিটাল সেবাগুলো এখন কয়েকটি বিশাল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ক্লাউড নির্ভরতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ফলে এই বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনা, অপরিচিত সফটওয়্যার ত্রুটি বা সামান্য ভুল পুরো ইন্টারনেট জগতকে নাড়িয়ে দিতে পারে।
একজন সাবেক সরকারি প্রযুক্তি কর্মকর্তা বলেন, সাম্প্রতিক ধারাবাহিক বিপর্যয়গুলো যেন সেই সময়ের পূর্বাভাসের মতো যখন বলা হয়েছিল নতুন সহস্রাব্দের শুরুতে ব্যাপক প্রযুক্তিগত অচলাবস্থা দেখা দেবে। অথচ এখন তা আরও ঘন ঘন ঘটছে।
কম্পিউটার বিজ্ঞানের জগতে এ ধরনের বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে রসিকতা ও মিমও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বড় ক্লাউড প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রায়ই হাইপারস্কেলার বলা হয়, কারণ তারা দ্রুত অবকাঠামো বাড়াতে পারে এবং কম খরচে সেবা দিতে সক্ষম হয়। তবে এর ফলে কিছু প্রতিষ্ঠান বাজারে এতটাই আধিপত্য বিস্তার করেছে যে তাদের যেকোনো ত্রুটি পুরো ব্যবস্থায় একক কেন্দ্রীয় ব্যর্থতা তৈরি করছে।
একজন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেন, যখন একটি প্রতিষ্ঠানের সামান্য ত্রুটিই কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন থামিয়ে দিতে পারে, তখন এটি শুধু প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয় বরং বাজারে অতিরিক্ত কেন্দ্রিকতার পরিচয়।
ইন্টারনেট যুগের শুরু থেকেই মাঝে মাঝে এ ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনটি বড় অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে যা বিশেষজ্ঞদের মতে নজিরবিহীন। প্রথম বিপর্যয় ঘটে অক্টোবরের মাঝামাঝি, যখন একটি শীর্ষ ক্লাউড সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের ত্রুটির কারণে জনপ্রিয় গেমিং সেবা, ক্যামেরা সেবা এমনকি স্মার্ট বেড পর্যন্ত অচল হয়ে পড়ে।
ঘটনার পর প্রযুক্তি খাতের কঠোর সমালোচক এক মার্কিন নীতি-নির্ধারক জানান, যে প্রতিষ্ঠান পুরো ইন্টারনেটকে অচল করে দিতে পারে তাদের আকার নিয়ন্ত্রণে আনা উচিত।
অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে আরেক বড় ক্লাউড প্ল্যাটফর্ম বিশ্বব্যাপী বিপর্যয়ে পড়ে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির অনেক সেবা একযোগে বন্ধ হয়ে যায় এবং দুটি বড় এয়ারলাইনের যাত্রীরা অনলাইনে চেক-ইন করতে পারেননি।
এরপর সর্বশেষ ঘটা বিপর্যয়টি ছিল ক্লাউড অবকাঠামো পরিচালনাকারী আরেক প্রতিষ্ঠানের ত্রুটিজনিত। তাদের প্রধান নির্বাহী এক বিবৃতিতে বলেন, এটি ২০১৯ সালের পর সবচেয়ে বড় অচলাবস্থা এবং এর প্রভাব তারা গভীরভাবে অনুধাবন করছেন।
তিনটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যার কারণ ছিল আলাদা। সর্বশেষ ঘটনার ক্ষেত্রে প্রথমে মনে হয়েছিল এটি বড় ধরনের সাইবার আক্রমণ। পরে দেখা যায় এটিতে ব্যবহৃত বট প্রতিরোধ ব্যবস্থার সফটওয়্যারে একটি বাগ ছিল। আর অন্য দুটি প্রতিষ্ঠানে সমস্যা হয়েছিল ডোমেইন নেম সিস্টেমে, যা ইন্টারনেটের ঠিকানামূলক তথ্য পরিচালনা করে।
গত বছরও এমন একটি অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছিল যখন বিশ্বজুড়ে বহু প্রতিষ্ঠান তাদের নিরাপত্তা সফটওয়্যারের স্বয়ংক্রিয় আপডেটে ত্রুটি দেখা দিলে সিস্টেমে নীল স্ক্রিন দেখায় এবং হাসপাতাল থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেটওয়ার্ক পর্যন্ত অচল হয়ে পড়ে।
একজন প্রযুক্তিনীতি বিশেষজ্ঞ বলেন, বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা শুধু ব্যবসায়িক ব্যবস্থার সমস্যা নয় বরং জাতীয় পর্যায়ে ঝুঁকি তৈরি করছে। তার মতে, সমাজের বড় অংশ যে অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে তা যখন অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকে তখন এর ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে যায়।
অন্যদিকে আরেক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ক্লাউড প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সবসময় ঝুঁকি কমানোর মতো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব, তবে তা কৌশলগতভাবে প্রয়োগ করা জরুরি।
বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ইন্টারনেট বিপর্যয়কে আর সাধারণ ত্রুটি হিসেবে দেখা উচিত নয়। একটি নাগরিক সংগঠনের প্রযুক্তি পর্যবেক্ষক জানান, এসব ঘটনার তদন্ত প্রয়োজন কারণ দেশগুলোর অর্থনীতি যে ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে তা পরিচালনা করছে অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠান যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।



