ফিলাডেলফিয়ার অ্যালেন লক এলিমেন্টারি স্কুলে বাংলাদেশ আর্টস লিগ্যাসি অ্যান্ড কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন বলাকা আয়োজিত লোক উৎসব ২০২৫ অনুষ্ঠিত হয় ২২ নভেম্বর শনিবার। প্রবাসে বাংলার লোকঐতিহ্য ধরে রাখা এবং নতুন প্রজন্মকে শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানটি রঙ, ছন্দ, সুর ও নৃত্যের মেলবন্ধনে পরিণত হয় এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়।
সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে উৎসবের উদ্বোধন করেন সঞ্চালক। উদ্বোধনী বক্তব্যে আহ্বায়ক প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষা ও ভবিষ্যত প্রজন্মের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বন্ধন দৃঢ় করার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে প্রবাসের ব্যস্ত জীবনে এমন আয়োজন শুধু বিনোদন নয় বরং সাংস্কৃতিক চর্চার এক অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অংশ।
প্রথম পরিবেশনায় নৃত্যশিল্পী মনোমুগ্ধকর একক নৃত্য উপস্থাপন করেন। তাঁর সুনিপুণ পদচারণা ও অভিব্যক্তিতে মুগ্ধ হয় উপস্থিত দর্শক। এরপর পরিবেশিত হয় গীতি আলেখ্য মনবেহুলার টানে। এতে অংশ নেন একদল গীতিনাট্যশিল্পী যারা নিজেদের অভিনয়, সঙ্গীত ও গতিময় উপস্থাপনার মাধ্যমে এই জনপ্রিয় লোকআখ্যানকে জীবন্ত করে তোলেন। পুরো পরিবেশনায় গ্রামীণ গল্পভাব, প্রেম, বেদনা ও সংগ্রামের সুর স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
পরবর্তীতে আরেক সঞ্চালকের সঞ্চালনায় শুরু হয় নৃত্যানুষ্ঠান। এতে সুস্মিতা গুপ্তর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের নৃত্যদল অংশ নেয়। তাঁদের দলীয় নৃত্য উপস্থাপনায় একদিকে যেমন দেখা যায় সমন্বিত ছন্দ, অন্যদিকে ফুটে ওঠে বাংলার ঐতিহ্যবাহী নৃত্যভঙ্গিমার স্বকীয়তা। দর্শকগণ করতালি দিয়ে তাঁদের উৎসাহিত করেন।
নৃত্যানুষ্ঠানের পর অনুষ্ঠিত হয় পুঁথি পাঠ। এ অংশে একজন পুঁথিপাঠক নিধনিয়ার ধন থেকে হৃদয়গ্রাহী অংশ পাঠ করেন যা শ্রোতাদের নিয়ে যায় প্রাচীন বাংলার লোকসাহিত্য আর আধ্যাত্মিক ভাবের জগতে। নিসর্গ, সমাজ, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং মানবিক অনুভূতির মিশ্রণে গড়া এই পাঠ ছিল দর্শকদের কাছে এক বিশেষ আকর্ষণ।
এরপর মঞ্চে ওঠেন অতিথি সংগীতশিল্পীরা। দুজন অতিথি তাঁদের একক সংগীত পরিবেশনার মাধ্যমে অনুষ্ঠানকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলেন। তাঁদের কণ্ঠে দেশীয় সুরের আবহ মন ছুঁয়ে যায় উপস্থিত সবার। অনুষ্ঠানস্থলে দুই শতাধিক দর্শকের উপস্থিতিতে পুরো আয়োজনটি রূপ নেয় প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক আড্ডায়।
উৎসব উপলক্ষে বলাকা প্রকাশ করে উৎসার নামে একটি স্মারক সংকলন। এতে সংরক্ষিত থাকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, গবেষণা লেখাসহ প্রবাসীদের বাংলা সংস্কৃতিচর্চার বিভিন্ন দিক। সংকলনের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বলাকার পক্ষ থেকে সকল শিল্পী, স্বেচ্ছাসেবক, পৃষ্ঠপোষক, সাংবাদিক, অতিথি এবং উপস্থিত দর্শকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। অনুষ্ঠানের শেষাংশে আয়োজকরা জানান যে ভবিষ্যতেও তারা প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত রাখবে।
বাংলা লোকসংস্কৃতির উৎস, শেকড় ও পরিচয় বহনকারী এই উৎসব প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য শুধু আনন্দের নয় বরং পরিচয় রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক আয়োজন হয়ে ওঠে। শিশু, কিশোর, তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্ক—সব বয়সী মানুষের অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।



