পূর্ব ইন্দোনেশিয়ার মালুকু বা পূর্বে পরিচিত “স্পাইস আইল্যান্ডস” আবারও বৈশ্বিক ভ্রমণপ্রেমীদের নজরে এসেছে। কয়েক শতাব্দী আগে ইউরোপীয় বণিকদের লোভনীয় লবঙ্গ, জায়ফল ও জাভিত্রির জন্য যে অঞ্চলটি ছিল দারুণ আকর্ষণীয়, তা এখন আধুনিক বিলাসবহুল ভ্রমণকারীদের নতুন নৌ-অভিযানের স্বর্গ। দুই দশক আগেও প্রায় বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপমালা এখন বিশ্বের নানা প্রান্তের দুঃসাহসী পর্যটকদের তালিকার শীর্ষে।
এ অঞ্চলের শত শত দ্বীপকে ঘিরে নানা উচ্চমানের নৌ-অভিযানের ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, যেখানে বিলাসবহুল ইয়ট থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক হসপিটালিটি ব্র্যান্ড পর্যন্ত নানা প্রতিষ্ঠান ভ্রমণ সেবা দিচ্ছে। অধিকাংশ নৌযাত্রায় মালুকুর পাশাপাশি রাজা আমপাটসহ আশেপাশের অঞ্চলও ঘুরে দেখা যায়, যা প্রকৃতির শেষ স্বর্গরাজ্যগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত।
একজন খ্যাতনামা হসপিটালিটি পরামর্শক জানান, ইন্দোনেশিয়ার এই পূর্বাঞ্চলীয় দ্বীপগুলো এখনো প্রকৃতির আদিম রূপ ধরে রেখেছে, যা কেবল সমুদ্রপথেই সঠিকভাবে দেখা সম্ভব। তাঁর ভাষায়, এখানে প্রবালপ্রাচীরের রঙিন বিস্ফোরণ, অক্ষত সমুদ্রের বুক চিরে উঠে দাঁড়ানো আগ্নেয়গিরি আর শতাব্দীপ্রাচীন সংস্কৃতি মিলেমিশে এক অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করে। প্রতিটি দ্বীপের নিজস্ব ভাষা ও ঐতিহ্য রয়েছে, যা পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।
একটি আন্তর্জাতিক ভ্রমণ প্রতিষ্ঠানের এশিয়া-প্যাসিফিক বিশেষজ্ঞ জানান, এ অঞ্চলের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে মূলত পানির নিচের অসাধারণ জীববৈচিত্র্যের কারণে। বিশ্বের অন্য কোথাও দেখা যায় না এমন প্রবাল প্রজাতি এবং প্রচুর সামুদ্রিক প্রাণী এখানে পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ে।
বিখ্যাত ভ্রমণ সংস্থা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এক্সপেডিশনসও এ অঞ্চলে বিলাসবহুল যাত্রার আয়োজন করছে। তাদের দুই সপ্তাহের একটি ভ্রমণে ব্যবহৃত হয় একটি দীর্ঘ-পাল্লার সমুদ্রগামী জাহাজ, যা আগে একজন অভিজাত ইউরোপীয় পরিবারের ব্যক্তিগত ইয়ট ছিল। যাত্রায় থাকে স্কুবা ডাইভিং, গুরমে খাবার, বালিনিজ ম্যাসাজসহ নানা সুবিধা।
একটি বিলাসবহুল ভ্রমণ সংস্থার প্রধান নির্বাহী জানান, তাঁরা বড় জাহাজ এড়িয়ে ছোট যাত্রীবাহী ইয়ট ব্যবহার করেন যাতে দূরবর্তী অঞ্চল সহজে ঘুরে দেখা যায়। কম যাত্রীর কারণে নির্দিষ্ট সময়সূচির চাপ থাকে না, ফলে ভ্রমণকারীরা চাইলে পানিতে বেশি সময় কাটাতে পারেন বা দ্বীপে স্বাধীনভাবে ঘুরে দেখতে পারেন।
প্রাচীন ‘ফিনিসি’ নৌযানও আজ আধুনিক রূপে ভ্রমণকারীদের নিয়ে যাচ্ছে স্পাইস আইল্যান্ডস ঘুরে দেখতে। কাঠের তৈরি একটি ১৪ যাত্রীর জাহাজ, যার নির্মাণ হয়েছে সুলাওয়েসির উপকূলে, এখন বিলাসবহুল সুযোগ-সুবিধায় সাজানো। এখানে রয়েছে অনবরত স্পা সেবা, যোগব্যায়াম, ধ্যান, জেট স্কি, আন্ডারওয়াটার স্কুটারসহ নানা ধরনের জলখেলাধুলার সরঞ্জাম। নৌযানের সহমালিক জানান, ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মিশেলে এটি ইন্দোনেশিয়ার আত্মাকে বহন করে।
তিন দশকের পুরোনো আরেক নৌভ্রমণ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক জানান, অতীতে তাঁরা তুলনামূলক সাশ্রয়ী ভ্রমণের ব্যবস্থা করলেও বর্তমানে ভ্রমণকারীরা বিলাসিতা, সাচ্ছন্দ্য আর অনন্য অভিজ্ঞতা চান। সেই চাহিদায় তাঁরা নিজেদের সেবায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন, যদিও অভিযাত্রিক মনোভাব এখনো প্রতিষ্ঠানের মূল ভিত্তি।
রাজা আমপাট অঞ্চলকে আজ UNESCO গ্লোবাল জিওপার্ক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এখানে রয়েছে এক হাজারের বেশি মাছের প্রজাতি এবং ৫০০টিরও বেশি কঠিন প্রবাল। বিশ্বের শীর্ষ ডাইভিং স্পটগুলোর একটি এই অঞ্চল, যেখানে একবারের ডাইভে ৩৭৪ প্রজাতির মাছ দেখা যাওয়ার রেকর্ড রয়েছে।
রাজা আমপাটের জঙ্গলঘেরা কার্স্ট দ্বীপগুলো বিরল পাখির জন্যও বিখ্যাত। স্বচ্ছ পানির কারণে ডাইভিং, স্নরকেলিং বা প্যাডেলবোর্ডিং—সব ক্ষেত্রেই অসাধারণ অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। অনেক ভ্রমণে আবার কোমোডো দ্বীপে ড্রাগন এবং সুম্বা দ্বীপে স্থানীয় ঘোড়সওয়ারদের শোও দেখা যায়।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নতুন ভ্রমণসূচিতে এখনো এমন বহু দ্বীপ রয়েছে যা পর্যটনের স্পর্শে আসেনি। বিশেষ করে কেই ও আরু দ্বীপমালা এবং বান্দা আইল্যান্ডসের মতো অঞ্চল নতুন অভিযাত্রীদের জন্য এক উত্তেজনাপূর্ণ অভিজ্ঞতা হয়ে উঠছে। ভ্রমণ শেষে অনেকেই জানান, এ যাত্রা তাঁদের মানসিক ও অভিজ্ঞতার দিক থেকে গভীরভাবে পরিবর্তন করে দেয়।



