Tuesday, January 13, 2026
spot_img
Homeএডুকেশননতুন সংজ্ঞায় স্কুলে কী বদল আনতে পারে ডিসলেক্সিয়া চিহ্নিতকরণ

নতুন সংজ্ঞায় স্কুলে কী বদল আনতে পারে ডিসলেক্সিয়া চিহ্নিতকরণ

আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের একটি দল সম্প্রতি ডিসলেক্সিয়ার হালনাগাদ সংজ্ঞা প্রকাশ করেছে, যা ভবিষ্যতে শিক্ষানীতি এবং স্কুলে শিক্ষার্থীদের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। ডিসলেক্সিয়া একটি স্নায়ুবৈজ্ঞানিক অবস্থা যা একজন ব্যক্তির পড়া ও বানান করার সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। গত এক দশকে বিষয়টি ক্রমশ আলোচনায় এসেছে, বিশেষ করে অভিভাবক মহলে সচেতনতা বাড়ার পর। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৪টি অঙ্গরাজ্যে বিদ্যালয়গুলোকে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ডিসলেক্সিয়া স্ক্রিনিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

সম্প্রতি অ্যান্তারন্যাশনাল ডিসলেক্সিয়া অ্যাসোসিয়েশন তাদের দুই দশক পুরোনো সংজ্ঞা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ দিয়েছে। ২০০২ সালের সংজ্ঞায় ডিসলেক্সিয়াকে সাধারণত অন্যান্য মানসিক সক্ষমতার তুলনায় অপ্রত্যাশিত দুর্বলতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। নতুন সংজ্ঞায় সেই অংশ আর নেই, যা অনেক রাজ্যের স্ক্রিনিং পদ্ধতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। গবেষণা অনুযায়ী, ডিসলেক্সিয়া বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এবং এই অবস্থায় থাকা শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সফলও হতে পারে। ষাট ও সত্তরের দশকে গবেষকেরা মূলত সেই শিক্ষার্থীদের ডিসলেক্সিয়া রোগী হিসেবে চিহ্নিত করতেন যাদের পাঠ দক্ষতা তাদের বুদ্ধিমত্তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। এই ধারণার ওপর নির্ভর করেই তৈরী হয় জনপ্রিয় ডিসক্রেপেন্সি মডেল, যেখানে বুদ্ধিমত্তা ও পাঠদক্ষতার মধ্যে অপ্রত্যাশিত ব্যবধান দেখা গেলে শিক্ষার্থীকে ডিসলেক্সিয়া আক্রান্ত বলে বিবেচনা করা হয়।

তবে দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা বলছে, এই মডেল অনেক শিক্ষার্থীকে শনাক্তকরণের বাইরে রেখে দিচ্ছে। নতুন সংজ্ঞা প্রস্তুতকারী কমিটির সহসভাপতির বক্তব্য অনুযায়ী, গড় বা গড়ের নিচে আইকিউ সম্পন্ন শিক্ষার্থীরাও এমন শব্দ উচ্চারণ ও বানান সমস্যায় ভুগতে পারে যা গড় বা উচ্চ আইকিউ সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের সমস্যার সঙ্গে বিশেষভাবে ভিন্ন নয়। অর্থাৎ কগনিটিভ পরীক্ষার ফলাফল এবং পড়ার দক্ষতার মধ্যে অপ্রত্যাশিত ব্যবধান না থাকলেও একজন শিক্ষার্থী ডিসলেক্সিয়া আক্রান্ত হতে পারে।

ইউনিভার্সিটি অফ কানেকটিকাটের বিশেষ শিক্ষা বিভাগের একজন সহযোগী অধ্যাপক বলেন, নির্দিষ্ট ব্যবধানকে মানদণ্ড হিসেবে ধরে রাখা ডিসলেক্সিয়ার প্রকৃত স্বরূপকে সঠিকভাবে তুলে ধরে না। অ্যাসোসিয়েশনটি সরাসরি কোনো অঙ্গরাজ্য বা জাতীয় নীতি নির্ধারণ করে না, কিন্তু সংশোধিত সংজ্ঞাটি স্কুল পর্যায়ে শনাক্তকরণ পদ্ধতিকে প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে করেন ন্যাশনাল সেন্টার ফর লার্নিং ডিজএবিলিটিসের এক নীতি কর্মকর্তা। তার মতে, গবেষণা থেকে বাস্তব প্রয়োগে পরিবর্তন আসতে সময় লাগলেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় বদলের ইঙ্গিত দেয়।

ফেডারেল আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শিক্ষণ অক্ষমতা শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে স্কুলগুলোকে বুদ্ধিমত্তা ও পাঠদক্ষতার মধ্যে তীব্র ব্যবধানকে বাধ্যতামূলক মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখা হয়েছে। যদিও অধিকাংশ অঙ্গরাজ্য চাইলে এটি ব্যবহার করতে দেয়। ২০১৯ থেকে ২০২০ শিক্ষাবছরের তথ্য অনুযায়ী, চল্লিশটি অঙ্গরাজ্য স্কুলগুলোকে এই পদ্ধতি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই নীতি গড় বা গড়ের নিচে বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত করতে পারে এবং এটিকে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের বিষয় হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে এই পদ্ধতিতে অনেক শিক্ষার্থী, বিশেষ করে সংখ্যালঘু, ইংরেজি শিক্ষার্থী এবং নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুরা সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিসলেক্সিয়া শনাক্তে কগনিটিভ পরীক্ষার পরিবর্তে ফনোলজিক্যাল দক্ষতা, বাস্তব ও কল্পিত শব্দ পড়ার সক্ষমতা ইত্যাদি সরাসরি প্রভাবিত দক্ষতার পরীক্ষা বেশি কার্যকর। অনেক স্কুল আরটি আই বা রেসপন্স টু ইন্টারভেনশন পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকে। এই পদ্ধতিতে প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন স্তরের সহায়তা দেওয়া হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল মূল্যায়নে দেখা গেছে যে প্রথম শ্রেণিতে যারা পাঠ সহায়তা পেয়েছে তারা অনেক ক্ষেত্রে সহায়তা না পাওয়া শিক্ষার্থীদের চেয়েও কম দক্ষতা দেখিয়েছে।

অন্যদিকে কিছু বিশেষজ্ঞ নতুন সংজ্ঞার সমালোচনা করে বলছেন, অপ্রত্যাশিত দুর্বলতার অংশটি বাদ দিলে প্রতিভাবান কিন্তু ডিসলেক্সিয়া আক্রান্ত শিক্ষার্থীরা শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় বাদ পড়তে পারে। তারা মনে করেন দক্ষতার সঙ্গে বুদ্ধিমত্তার ব্যবধান মূল্যায়ন করলে এই শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করা সহজ হয়। একই ধারণা প্রতিফলিত হয়েছে একটি চলমান ফেডারেল আইনের খসড়াতেও, যেখানে ডিসলেক্সিয়াকে একটি স্বতন্ত্র ক্যাটাগরি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

তবে নতুন সংজ্ঞা প্রণয়নকারী কমিটির সহসভাপতি এই ধারণাকে ভুল বলে অভিহিত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের একটি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বিষয়ক কমিটির এক সহকারী জানান যে নতুন সংজ্ঞার মূল ভিত্তি হলো অপ্রত্যাশিত সমস্যা ধারণাটি। তাদের মতে কিছু পরিস্থিতিতে পাঠদক্ষতার দুর্বলতা প্রত্যাশিত হতে পারে, যেমন কোনো শিক্ষার্থী মস্তিষ্কে আঘাতজনিত কারণে সমস্যায় পড়লে। এমন পরিস্থিতিতে ডিসলেক্সিয়া নির্দিষ্ট সহায়তা কার্যকর নাও হতে পারে।

এই বিভিন্ন মতবিরোধের মধ্যেই স্পষ্ট যে নতুন সংজ্ঞা শিক্ষাক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য আলোচনার জন্ম দেবে এবং ভবিষ্যতে স্কুলগুলোতে ডিসলেক্সিয়া শনাক্তকরণ ও সহায়তা প্রদানের পদ্ধতিতে পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments