দীর্ঘ সুপ্ত আগ্নেয়গিরির হঠাৎ জাগরণ

ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলে দীর্ঘ সময় নিস্তব্ধ থাকা একটি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বিশেষজ্ঞদের ব্যাপক কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। গত রোববার আফার অঞ্চলের হায়লি গুব্বি নামের আগ্নেয়গিরিটি হঠাৎ সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং কয়েক ঘণ্টা ধরে অগ্ন্যুৎপাত চলার ফলে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছাইয়ের ঘন মেঘ ছড়িয়ে পড়ে। ছাইয়ের সেই মেঘ লোহিত সাগর অতিক্রম করে ইয়েমেন, ওমান এমনকি ভারতের কয়েকটি অঞ্চলেও পৌঁছে যায়।

রাজধানী আদ্দিস আবাবা থেকে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার উত্তর পূর্বে অবস্থিত এই আগ্নেয়গিরিটি প্রায় বারো হাজার বছর ধরে সুপ্ত ছিল। হঠাৎ অগ্ন্যুৎপাতের ফলে পার্শ্ববর্তী আফডেরা গ্রাম সম্পূর্ণ ছাইয়ে ঢাকা পড়ে। দীর্ঘ বিরতির পর এমন কার্যকলাপকে বিশেষজ্ঞরা অস্বাভাবিক বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁদের মতে এই অঞ্চলের আগ্নেয়গিরিগুলো সম্পর্কে গবেষণা অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় এর প্রকৃত আচরণ বোঝা কঠিন।

একজন মার্কিন আগ্নেয়গিরি বিশেষজ্ঞ জানান, ম্যাগমা সৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ বজায় থাকলে কোনো আগ্নেয়গিরি সহস্র বছর সুপ্ত থেকে হঠাৎ সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। পূর্ব আফ্রিকার রিফ্ট জোনে অবস্থিত হায়লি গুব্বি মূলত একটি শিল্ড আগ্নেয়গিরি যেখানে আফ্রিকান ও আরব টেকটোনিক প্লেট ধীরে ধীরে একে অপরের থেকে সরে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে এই ধীর গতির বিচ্ছিন্নতাই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনে প্রভাব ফেলতে পারে।

একজন ব্রিটিশ ভূবিজ্ঞানী জানান, বারো হাজার বছর আগে সর্বশেষ অগ্ন্যুৎপাত হয়ে থাকলে তা অত্যন্ত বিস্ময়কর। কারণ স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে কিছু সাম্প্রতিক লাভা প্রবাহের ইঙ্গিত মিলছে যা প্রমাণ করে আগ্নেয়গিরিটি সম্ভবত প্রত্যাশার চেয়ে আগে সক্রিয় হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, এই অঞ্চলে বিশাল ছাতার মতো ছাইয়ের মেঘ সৃষ্টি হওয়া খুবই বিরল ঘটনা এবং এটি পরিস্থিতির অস্বাভাবিকতাকেই স্পষ্ট করে।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, অগ্ন্যুৎপাতে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। তবে পশুপালন নির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবনে এর প্রভাব তীব্র হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা এও জানিয়েছেন, অগ্ন্যুৎপাতের আগেই বেশ কয়েকটি সতর্ক সংকেত ধরা পড়েছিল। গত জুলাইয়ে নিকটবর্তী এরতা আলে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের পর হায়লি গুব্বির নিচের ভূস্তরে নড়াচড়া শুরু হয়। ভূগর্ভের তিরিশ কিলোমিটার গভীরে ম্যাগমার সঞ্চালনের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। রোববারের অগ্ন্যুৎপাতের ঠিক আগে হায়লি গুব্বির চূড়ায় সাদা মেঘ এবং সামান্য ভূউত্থানও রেকর্ড করা হয়।

ইথিওপিয়ায় অবস্থানরত একজন ব্রিটিশ ভূতত্ত্ববিদ অগ্ন্যুৎপাতের পরের দিন ছাইয়ের নমুনা সংগ্রহ করেছেন। তাঁর মতে এই নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে ম্যাগমার প্রকৃতি নির্ধারণ করা যাবে এবং বাস্তবে আগ্নেয়গিরিটি কত বছর সুপ্ত ছিল তা যাচাই করা সম্ভব হবে। তিনি মনে করেন সাম্প্রতিক ঘটনাটি স্পষ্ট করে যে এই অঞ্চল সম্পর্কে এখনো অল্পই জানা গেছে।

ফ্রান্সের ভিএএসি জানিয়েছে অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সৃষ্টি হওয়া ছাইয়ের মেঘ আকাশে চৌদ্দ কিলোমিটার পর্যন্ত উঠে যায়। এর প্রভাব ইয়েমেন, ওমান, ভারত ও উত্তর পাকিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। প্রায় পাঁচশ মিটার উচ্চতার হায়লি গুব্বি মূলত এমন একটি রিফ্ট ভ্যালিতে অবস্থিত যেখানে টেকটোনিক প্লেটের সম্মিলন ঘটছে বলে মনে করা হয়।

স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের গ্লোবাল ভলক্যানিজম প্রোগ্রাম জানিয়েছে হলোসিন যুগে এই আগ্নেয়গিরিতে কোনো পরিচিত অগ্ন্যুৎপাতের তথ্য নেই। তাই সাম্প্রতিক ঘটনার ব্যাখ্যা এখনো গবেষণার পর্যায়ে এবং বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এটি অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন তৈরি করবে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed