দক্ষিণ থাইল্যান্ডে বিরল মাত্রার বৃষ্টিপাতে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র বন্যা পরিস্থিতি, যার ফলে কিছু অঞ্চলে পানির উচ্চতা আট ফুটেরও বেশি পৌঁছেছে এবং একটি শহরে নবজাতকসহ মাতৃত্ব বিভাগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও হাসপাতাল কর্মীরা।
দেশটির জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দক্ষিণাঞ্চলে কমপক্ষে ১৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন যাদের বেশিরভাগই বিদ্যুতায়ন এবং বন্যাসংক্রান্ত দুর্ঘটনার শিকার।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা গেছে সঙখলা প্রদেশের বাণিজ্য ও যোগাযোগকেন্দ্র হাট ইয়াই শহরে। দেশটির সেচ অধিদপ্তর জানিয়েছে, শহরটি যে বর্ষণ দেখেছে তা বিগত তিন শতকে সবচেয়ে বিরল এবং এমন বৃষ্টিপাত পরিসংখ্যানগতভাবে তিনশ বছরে একবার ঘটার সম্ভাবনা থাকে। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই বর্ষণই বর্তমানে সৃষ্ট বন্যার মূল কারণ।
সোমবার পর্যন্ত দক্ষিণ থাইল্যান্ডের নয়টি প্রদেশ এখনো প্লাবিত রয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা এক লাখ সাতাশ হাজারের বেশি। বিভিন্ন এলাকায় প্রায় চারশ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। টানা বর্ষণের সঙ্গে উপচে পড়া নদী এবং আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
হাট ইয়াই শহরে পানির উচ্চতা দেড় থেকে আড়াই মিটার পর্যন্ত পৌঁছে ঘরবাড়ি, সড়ক ও দোকানপাট তলিয়ে যায়। শহরের দৃশ্যে দেখা গেছে সড়ক ডুবে গেছে, ঘরবাড়ির অর্ধেক অংশ পানির নিচে এবং উদ্ধারকর্মীরা নৌকায় করে মানুষকে সরিয়ে নিচ্ছেন ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন।
হাট ইয়াই হাসপাতালের কর্মীরা জানান, সোমবার রাত থেকে হাসপাতালের বিদ্যুৎব্যবস্থা আংশিক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং পানির সরবরাহ ব্যাহত হয়। হাসপাতালের নবজাতক বিভাগে প্রায় ৩০ নবজাতক রয়েছে যাদের কেউই পরিবারের সদস্যদের কাছে যেতে বা তাদের নিতে আসা সম্ভব হয়নি। হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্সরা জানান, পরিবারগুলো উদ্বিগ্ন থাকলেও পানি বেড়ে যাওয়ায় এবং সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ থাকায় তারা কোনোভাবে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারছেন না।
নবজাতক ওয়ার্ডের একটি কক্ষে কর্মীদের মোমবাতির আলো কিংবা একক বাতির আলোয় কাজ করতে দেখা গেছে। ঘরটি ঠান্ডা রাখতে শিশুর খাটগুলোর চারপাশে কয়েকটি স্ট্যান্ড ফ্যান বসানো হয়েছে। ওয়ার্ডটি হাসপাতালের তৃতীয় তলায় হওয়ায় এখনও নিরাপদ বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মীরা।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, বর্তমানে হাসপাতালে প্রায় পাঁচশ মানুষ অবস্থান করছেন যার মধ্যে দুশ জন ভর্তি রোগী। তারা দ্রুত বিশুদ্ধ পানির সরবরাহের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা দাবি করেছেন এবং জানিয়েছেন যে পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে কারণ পানি এখন দ্বিতীয় তলায় পৌঁছাতে শুরু করেছে।
দেশটির সেচ অধিদপ্তর জানিয়েছে, তারা বিভিন্ন সরকারি সংস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে লোকজনকে সরিয়ে নিতে এবং খাদ্য ও পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে ট্রাক পাঠানো হচ্ছে। পাশাপাশি দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য অসংখ্য ওয়াটার পাম্প ও প্রপেলার বসানো হয়েছে যা সঙখলা হ্রদ এবং থাইল্যান্ডের পূর্ব উপকূল সংলগ্ন উপসাগরে পানি সরিয়ে দেবে।
ভারী বৃষ্টি কমে এলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাবে বলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ আশা করলেও নিম্নাঞ্চলগুলোকে এখনো বিশেষ সতর্কতায় রাখা হয়েছে।
টানা বৃষ্টিপাতে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মালয়েশিয়ায় পনের হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন যদিও এখনো কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে ভিয়েতনামের কেন্দ্রীয় অংশে বন্যা ও ভূমিধসে গত এক সপ্তাহে ৯১ জন নিহত হয়েছেন এবং এগারো লাখ পরিবারের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তবে সোমবার থেকে সেদেশে পানি নামতে শুরু করেছে বলে জানা গেছে।



