Wednesday, February 4, 2026
spot_img
Homeবিজনেসডলারের দরপতন, বিশ্ববাজারে নতুন বার্তা

ডলারের দরপতন, বিশ্ববাজারে নতুন বার্তা

বিশ্ববাজারে ডলারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। একই সময়ে সোনার বাজারে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। মাত্র দুই দিন আগেই আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আউন্সপ্রতি পাঁচ হাজার ডলারের সীমা অতিক্রম করে। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার প্রতি ঝোঁক বাড়ার পাশাপাশি বিশ্বের প্রধান মুদ্রাগুলোর বিপরীতে ডলারের মান দুর্বল হয়ে পড়েছে। ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক মুদ্রার তুলনায় ডলারের অবস্থান বর্তমানে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির পর সর্বনিম্ন স্তরে।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো তার আর্থিক প্রভাব, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মার্কিন মুদ্রা ডলার। বৈশ্বিক বাণিজ্যের বড় একটি অংশ ডলারে সম্পন্ন হওয়ায় এই মুদ্রার ওঠানামা আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নানা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক বাজারে আস্থার ঘাটতি ডলারের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এসব কারণেই ডলারের মান ক্রমান্বয়ে দুর্বল হচ্ছে।

ডলারের দরপতনের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার আরও কমাতে পারে। পাশাপাশি শুল্কনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা, নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতার অভাব এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়ে সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের আশঙ্কাও বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান রাজস্বঘাটতি। এসব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, দেশটির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

ডলারের দাম কমার একটি তাৎক্ষণিক সুফল রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানিকারকদের জন্য। দুর্বল ডলারের ফলে মার্কিন পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলকভাবে সস্তা হয়ে ওঠে, যা প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি করে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে বলেন, তিনি ডলারের মূল্য খুব বেশি কমে যাক তা চান না, আবার অস্বাভাবিকভাবে বাড়ুক সেটিও কাম্য নয়। তাঁর মতে, ডলার বর্তমানে গ্রহণযোগ্য অবস্থানেই রয়েছে।

তবে বাস্তবে তাঁর এই মন্তব্যের পর বাজারে ডলারের ওপর চাপ আরও বেড়েছে। ডলার ইনডেক্স, যা ছয়টি প্রধান মুদ্রার বিপরীতে ডলারের শক্তি নির্দেশ করে, তা নেমে এসেছে ৯৫ দশমিক ৫৬৬ পয়েন্টে। এটি প্রায় চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে তিনি এশিয়ার কয়েকটি বড় অর্থনীতির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, অতীতে ওই দেশগুলোর সঙ্গে মুদ্রার মান নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা করতে হয়েছে, কারণ তারা নিজেদের মুদ্রাকে দুর্বল রাখতে আগ্রহী ছিল।

ডলারের ওপর সাম্প্রতিক চাপ বৃদ্ধির আরেকটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সম্ভাব্য যৌথ হস্তক্ষেপের গুঞ্জন। বাজারে ধারণা ছড়ায় যে দুর্বল হয়ে পড়া ইয়েনকে শক্তিশালী করতে দুই দেশের কর্তৃপক্ষ মুদ্রাবাজারে পদক্ষেপ নিতে পারে। এই সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়ার পর মাত্র দুই অধিবেশনে ইয়েনের দর প্রায় চার শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। সাধারণত এ ধরনের রেট চেক বা বাজার পরিস্থিতি যাচাইকে সরকারি হস্তক্ষেপের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা হয়।

বৈদেশিক মুদ্রাবাজার বিশ্লেষকদের মতে, যখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ডলারের দুর্বলতা নিয়ে উদাসীনতা বা পরোক্ষ সমর্থনের ইঙ্গিত আসে, তখন বাজারে ডলার বিক্রির প্রবণতা আরও জোরালো হয়। এতে স্বল্পমেয়াদে ডলারের পতন ত্বরান্বিত হতে পারে।

ডলারের দুর্বলতার প্রভাব অবশ্য একমাত্রিক নয়। একদিকে এটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগকে প্রকাশ করে এবং আমদানির খরচ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য এটি সুবিধাজনক, কারণ বিদেশে অর্জিত আয় ডলারে রূপান্তরের সময় তুলনামূলক বেশি মূল্য পাওয়া যায়। একই সঙ্গে ডলারে ঋণ নেওয়া দেশ ও করপোরেশনগুলোর জন্য ঋণ পরিশোধের চাপ কিছুটা হালকা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, দুর্বল ডলার এক ধরনের দুধারী তলোয়ার। এটি যেমন রপ্তানি ও বহুজাতিক ব্যবসার জন্য ইতিবাচক, তেমনি আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়ায়।

বিশ্ববাজারে ২০২৫ সালে ডলারের দরপতন ইতোমধ্যে ৯ শতাংশ ছাড়িয়েছে। তবে এর প্রভাব বাংলাদেশের বাজারে তেমনভাবে পড়েনি। দেশের বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই ডলারের বিনিময় হার প্রায় ১২২ টাকায় স্থিতিশীল রয়েছে। জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মিত বাজার থেকে ডলার কিনে এই স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments