কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূলে এক জেলের জালে ধরা পড়েছে প্রায় পনের মণ ওজনের একটি বিশাল আকৃতির মাছ, যা এলাকাজুড়ে ব্যাপক কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে। অস্বাভাবিক এই দানবীয় মাছটি দেখতে ভিন্ন প্রকৃতির হওয়ায় জেলেদের পাশাপাশি এলাকাবাসীও হুমড়ি খেয়ে পড়ে তা একনজর দেখার জন্য। নৌকা থেকে মাছটি নামানো এবং উপকূলে নিয়ে আসার প্রক্রিয়াই ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং। ওজনের কারণে একা তো দূরের কথা, কয়েকজন মিলে টেনে তুলতেও হয়েছে যথেষ্ট পরিশ্রম। উপকূলে পৌঁছানোর পর মুহূর্তেই মাছটি ঘিরে ভিড় জমায় শত শত মানুষ।
স্থানীয় জেলেদের কাছে মাছটি শাপলা পাতা নামে পরিচিত। এটি হাঙর প্রজাতির স্টিংরে পরিবারের একটি সদস্য, যা বাংলাদেশের বন্য প্রাণী আইনে ধরা ও বিক্রি নিষিদ্ধ। আইনগত নিষেধাজ্ঞা থাকলেও মাছটি স্থানীয়ভাবে উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়েছে, যা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি নিয়ে।
গতকাল শুক্রবার বিকেলে টেকনাফের সাবরাং মুন্ডার ডেইল এলাকার উপকূলে জেলের জালে এই বিশাল মাছটি ধরা পড়ে। ওজন এতটাই বেশি ছিল যে জেলেরা প্রথমে সেটিকে ট্রলারে তুলতেই ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে রশি বেঁধে কয়েকজনের সহায়তায় ধীরে ধীরে টেনে উপকূলে আনতে সক্ষম হন। জেলে জানান, জীবনে প্রথমবার এত বড় শাপলা পাতা মাছ দেখেছেন। অভিজ্ঞ জেলেদের মাঝেও এ ধরনের মাছ ধরা পড়ার ঘটনা বিরল বলে গণ্য করা হয়।
টেকনাফ উপজেলা মৎস্য দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, জালের ফাঁদে ধরা পড়া মাছটি আসলে শাপলা পাতা বা পাতা হাঙর। এটি আইন অনুযায়ী ধরা নিষিদ্ধ তালিকায় রয়েছে। গভীর সমুদ্রে বসবাসের কারণে সাধারণত এগুলো অগভীর উপকূলে আসে না। তবে সাগরের জোয়ার ভাটার স্রোতের কারণে মাঝে মাঝে গভীর পানির প্রাণী উপকূলীয় অঞ্চলে চলে আসে বলে অভিমত দিয়েছেন স্থানীয় জেলেরা। তাঁদের মতে, ঠিক এমনই কারণে মাছটি ধরা পড়েছে, নইলে যে স্থানে জাল ফেলা হয়েছিল সেখানে এ ধরনের মাছ ওঠার সম্ভাবনা নেই।
মাছটি উপকূলে আনার পর স্থানীয় ফিশিং ঘাটে ব্যাপক ভিড় বেড়ে যায়। পর্যটকরাও কৌতূহল ছড়ানো এই মাছটি দেখতে ছুটে আসেন। মাছ ব্যবসায়ীদের একজন জানান, তিনি প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকায় মাছটি কিনেছেন এবং সেটি টুকরা করে চট্টগ্রামে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। তবে আইনগত বিধিনিষেধের কারণে এটি নিয়ে প্রশাসনিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে শাপলা পাতা একটি সংরক্ষিত জলজ প্রাণী হিসেবে তালিকাভুক্ত। আইনের ধারা ৩৮ অনুযায়ী, সংরক্ষিত প্রাণী হত্যা, সংগ্রহ, অধিকার, পরিবহন, বিক্রি বা কেনা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। এর শাস্তি সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড।
বন বিভাগের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, ঘটনাটি সম্পর্কে তাঁদের দপ্তর অবগত ছিল না, তবে দ্রুত তদন্ত শুরু করা হচ্ছে। মাছটি যিনি কিনেছেন, তাঁর অবস্থান শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
শাপলা পাতা মাছটি ধরা পড়ার ঘটনাটি শুধু আইন লঙ্ঘনের বিষয়ই নয়, পাশাপাশি গভীর সমুদ্রের বাসিন্দা এক প্রাণী কীভাবে উপকূলীয় জালে ধরা পড়ল, সেটিও এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। স্থানীয় মৎস্যজীবী এবং প্রশাসনের ব্যাখ্যা মিললেও বিষয়টি নিয়ে জনমনে নতুন প্রশ্ন জন্মেছে। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষার ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ভবিষ্যতে আরও নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দেয়।



