জার্মানি ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তোলার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেই লক্ষ্য পূরণের পথে একটি নতুন আইন প্রস্তাব দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা আরও তীব্র করেছে। বহু বছর ধরে অবহেলার শিকার জার্মান সামরিক বাহিনীকে ভিত্তি থেকে পুনর্গঠনের এই প্রচেষ্টা মূলত রাশিয়া সংক্রান্ত নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে গতি পেয়েছে।
গত সপ্তাহে সরকার যে বিস্তৃত সংস্কার পরিকল্পনায় সম্মত হয়েছে, তার লক্ষ্য হলো ২০৩৫ সালের মধ্যে সৈন্য সংখ্যা বর্তমান প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ ৬০ হাজারে উন্নীত করা। একই সঙ্গে ২ লাখ অতিরিক্ত রিজার্ভ সদস্য যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রাথমিকভাবে এই উদ্যোগ স্বেচ্ছাসেবী যোগদানের ওপর নির্ভর করবে এবং আগ্রহী তরুণদের জন্য আর্থিক প্রণোদনা বাড়ানো হবে। নতুন কাঠামোতে মাসিক শুরুর বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৬০০ ইউরো, যা আগের চেয়ে ৪৫০ ইউরো বেশি।
তবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে বাধ্যতামূলক সেনা ডাকে যাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। আগামী বছর থেকে সব ১৮ বছরের তরুণকে একটি প্রশ্নপত্র পাঠানো হবে। পুরুষদের জন্য প্রশ্নপত্রের উত্তর দেওয়া বাধ্যতামূলক হবে। ২০২৭ সাল থেকে ১৮ বছরের পুরুষদের জন্য মেডিকেল পরীক্ষাও বাধ্যতামূলক করা হবে।
এমন সময়ে এই প্রস্তাব এসেছে যখন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপকে নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার প্রতি সতর্ক করেছে এবং ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়া সম্পর্কিত উদ্বেগ বাড়ছে। ইউরোপ বিষয়ক এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একজন সহযোগী বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, জার্মানির ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় দেশটি ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তার মতে বাস্তব অগ্রগতি দেখা যেতে সময় লাগবে এবং তা সম্ভবত ২০৩০ দশকের আগেই হবে না।
এদিকে জার্মানির সামরিক প্রধান বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সতর্ক করেছেন যে ন্যাটোকে আগামী চার বছরের মধ্যেই রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। ২০২৯ সালেও এমন হুমকি দেখা দিতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
নতুন আইন নিয়ে সরকারের জোটভুক্ত দুই প্রধান দলের মধ্যে দীর্ঘদিন আলোচনা চলে। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে লটারির মাধ্যমে তরুণদের বাছাই করার ধারণাও ছিল, তবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী শেষ পর্যন্ত সেটি বাতিল করেন এবং স্বেচ্ছাসেবী যোগদানকেই মূল পথ হিসেবে বজায় রাখেন।
জার্মানি পূর্বে ১৮ থেকে ২৩ বছর বয়সী পুরুষদের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা চালু রেখেছিল, যা ২০১১ সালে বন্ধ করা হয়। নতুন আইন কার্যকর হতে হলে সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন এবং বছরের শেষ নাগাদ এ নিয়ে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে। অনুমোদন মিললে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আইন কার্যকর হবে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জানিয়েছেন উদ্বেগের কোনো কারণ নেই এবং শক্তিশালী প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে পারলে সংঘাতের ঝুঁকি কমে যায়। তার মতে ইউরোপের অন্যান্য দেশও জার্মানির নতুন মডেল লক্ষ্য করছে এবং এটি ভবিষ্যতে আদর্শ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
তবে সমালোচনা কম নেই। রাজনৈতিক বামপন্থিদের বড় অংশ বাধ্যতামূলক সেনা সেবা ফিরিয়ে আনার বিরুদ্ধে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, একটি বামপন্থি দলের অধিকাংশ সমর্থক এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, স্বেচ্ছাসেবী যোগদানের মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হলেও বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা চাপিয়ে দিলে তরুণদের ভেতরে রাজনৈতিক চরমপন্থার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বেশ কিছু তরুণ জানিয়েছেন যে বাধ্যতামূলক সেনা সেবা চালু হলে তাদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হতে পারে। অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধে উদ্বেগ বাড়ার পর থেকে বিবেকগত কারণে সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতি চাওয়ার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা ২০১১ সালের পর সর্বোচ্চ।
জার্মান সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে সীমিত বিনিয়োগে চলছিল। শীতল যুদ্ধের পর বহু বছর জিডিপির দুই শতাংশের কম বরাদ্দ রাখা হয়। ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি পুরো চিত্র বদলে দেয় এবং প্রতিরক্ষা খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের পথ তৈরি হয়। বর্তমান সরকারের অধীনে নতুন চ্যান্সেলর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে ব্যয় দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।



