গোপন সম্পদের আইনি লড়াইয়ে কানাডিয়ান বাসিন্দার পরাজয়

কানাডার উত্তর-পশ্চিম অন্টারিওর থান্ডার বে শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত এক গ্রামীণ বাড়ি থেকে অস্বাভাবিক স্থানে লুকিয়ে রাখা বিপুল পরিমাণ নগদ উদ্ধারকে কেন্দ্র করে প্রায় ১৬ বছর ধরে চলা আইনি লড়াইয়ের শেষ পরিণতি এসেছে। শেষ পর্যন্ত ওই বাসিন্দা তার গোপন করে রাখা এক মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলারের বেশি অর্থ ফেরত পাওয়ার দাবিতে হেরে গেছেন।

ঘটনাটি ২০০৯ সালের ১ ডিসেম্বর। আদালত নথি অনুযায়ী, অবৈধ অস্ত্রের সন্ধানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ওই বাসিন্দার বাড়িতে তল্লাশিতে গেলে বেরিয়ে আসে এক বিস্ময়কর তথ্য। বসার ঘরের ফ্লোর হিটিং ডাক্টে পাওয়া যায় ১৫ হাজার কানাডিয়ান ডলারের নোট। গ্যারেজের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পাওয়া যায় প্রায় ৩২ হাজার ডলার। এর সঙ্গে গ্যারেজের মাটির নিচে পুঁতে রাখা রাবারের টবে উদ্ধার হয় আরও এক দশমিক দুই মিলিয়নের বেশি কানাডিয়ান ডলার। সব মিলিয়ে সে সময় মার্কিন মুদ্রায় এর মূল্য দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১.১৯ মিলিয়ন ডলারে।

তল্লাশিতে এ অর্থ ছাড়াও বাড়ি থেকে কোকেইন, মারিজুয়ানা ও এক্সটেসি সহ বিভিন্ন ধরনের মাদক উদ্ধার হওয়ায় সেই সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বিস্ময় প্রকাশ করেন। ঘটনার পর অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অপরাধ থেকে অর্জিত সম্পদ রাখাসহ একাধিক অভিযোগ আনা হয় এবং প্রাথমিকভাবে তাকে দোষীও সাব্যস্ত করা হয়। তবে পুনর্বিচারে তিনি সফলভাবে যুক্তি তুলে ধরেন যে তার বাড়িতে তল্লাশি আইনসঙ্গত ছিল না। ফলে তিনি খালাস পান।

কিন্তু এরপর দেখা দেয় উদ্ধার হওয়া বিপুল অর্থের মালিকানা নিয়ে আইনি প্রশ্ন। ২০২৩ সালে নিম্ন আদালত রায়ের মাধ্যমে অর্থের বড় অংশ সরকারকে দেওয়ার নির্দেশ দিলে তা চ্যালেঞ্জ করা হয়। অবশেষে সম্প্রতি অন্টারিওর আপিল আদালত সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।

রায়ে উল্লেখ করা হয়, বিচারকের মতে কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে বাড়ির নিচে পুঁতে রাখা বিশাল অঙ্কের নগদ রাখা স্বাভাবিক আচরণ নয়। উদ্ধার হওয়া নোটগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল ২০ কানাডিয়ান ডলারের নোট, যা অবৈধ মাদক বাণিজ্যে ব্যবহৃত সবচেয়ে প্রচলিত মূল্যমান। এছাড়া ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তি রাজস্ব বিভাগে কোনো আয় দেখাননি বলেও আদালতের নথিতে উঠে আসে।

বিচারকের কাছে অভিযুক্তের ব্যাখ্যাও গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। তিনি দাবি করেছিলেন, লটারিতে বা ক্যাসিনোতে জিতে অথবা গাড়ি মেরামতের ব্যবসা থেকে এই অর্থ পেয়েছেন। কিন্তু আদালত এসব কারণ বিশ্বাসযোগ্য মনে করেনি। ফলে বিপুল অঙ্কের নগদ সম্পদ সরকারে জমা দেওয়ার আদেশ প্রদান করা হয়, যা আপিল আদালতও সমর্থন করেছে।

ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আইন বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেন, এ ধরনের ঘটনায় আদালত প্রায়ই আইনি টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে অর্থ জব্দের সিদ্ধান্তকে ন্যায়সঙ্গত করার চেষ্টা করে। তার মতে, সমাজ ধীরে ধীরে এমন অবস্থায় যাচ্ছে যেখানে খারাপ লোকদের ধরতে কিছু নিয়ম ভাঙাকেও স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা হচ্ছে, অথচ এই নিয়মগুলোই তৈরি হয়েছে যেন বিচারিক সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত ধারণা প্রভাব না ফেলে।

ম্যানিটোবা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক আইন বিশেষজ্ঞ জানান, এই ক্ষেত্রে অভিযুক্তের ওপরই প্রমাণ করার দায়িত্ব বর্তায় যে অর্থ বৈধভাবে এসেছে। তিনি বলেন, অবৈধ মাদক ব্যবসায় নগদই মূল চালিকাশক্তি, আর ব্যারেলে ভরে মাটির নিচে পুঁতে রাখা অর্থের বৈধ উৎস থাকা খুবই অস্বাভাবিক।

তবে পুরো ঘটনাই অভিযুক্তের জন্য নেতিবাচক ছিল না। আপিল আদালত নিম্ন আদালতের সেই সিদ্ধান্তটিও বহাল রেখেছে, যেখানে বলা হয়েছিল যে বাড়ির ভেন্টের ভিতরে পাওয়া ১৫ হাজার কানাডিয়ান ডলার ফেরত পেতে তিনি পারেন, কারণ ওই নির্দিষ্ট অংশের অর্থ বৈধ উৎস থেকে আসেনি—এটা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা যায়নি। বর্তমান হিসেবে যার মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১০ হাজার ৬০০ মার্কিন ডলার।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed