কাজাখস্তানের বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে বহু আগে যে একটি বৃহৎ ব্রোঞ্জ যুগের বসতি ছিল, তা নিয়ে গবেষকদের আগ্রহ বহু দিনের। ধারণা করা হয় প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব ১৬০০ সালের দিকে এই বসতিটি ছিল শক্তি ও বাণিজ্য আদানপ্রদানের একটি কেন্দ্র। সেমিয়ার্কা নামে পরিচিত এই স্থাপনাটি সাতটি উপত্যকার ওপর অবস্থিত হওয়ায় পরিচিত ছিল সেভেন রাভিনস সিটি নামে।
বিদেশি গবেষকদের একটি দল ২০১৮ সাল থেকে বিস্তৃত জরিপ চালানোর পর এই বসতির প্রকৃত ব্যাপ্তি ও গুরুত্ব স্পষ্টভাবে উঠে আসে। তারা দেখেন বিশাল এলাকার ওপর ছড়িয়ে আছে ঘরবাড়ির চিহ্ন, কেন্দ্রীয় এক বৃহৎ স্থাপনা যেটি হয়তো আচারবিধি বা প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত হতো, এমনকি টিন ব্রোঞ্জ তৈরির সাম্ভাব্য কারখানার নিদর্শনও পাওয়া যায়। টিন ব্রোঞ্জের ব্যবহার সেই সময়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ এটি দিয়ে আরও শক্তিশালী সরঞ্জাম ও উপকরণ তৈরির সুযোগ তৈরি হয়েছিল।
গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটিই এ অঞ্চলে দ্বিতীয় কোনো স্থাপনা যেখানে টিন ব্রোঞ্জ উৎপাদনের প্রমাণ মিলেছে। তারা মনে করেন, এই আবিষ্কার ইউরেশিয়ান স্টেপ অঞ্চলের প্রাগৈতিহাসিক নগরজীবন সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে পারে।
দলের এক সদস্য জানান, স্টেপ অঞ্চলে সাধারণত যাযাবর গোষ্ঠীর উপস্থিতি পাওয়া যায়, যেখানে তাঁবু বা ইউর্ট ব্যবহারের ধারণাই প্রচলিত। অথচ সেমিয়ার্কা একেবারেই ভিন্ন। ইর্তিশ নদীর উপত্যকার ওপরে প্রায় ১৪০ হেক্টরজুড়ে বিস্তৃত এই স্থাপনা ইঙ্গিত দেয় যে ব্রোঞ্জ যুগের উত্তরাঞ্চলেও সম্ভবত উন্নত নগর ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল।
জরিপের সময় উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে প্রতিটি ৫০ মিটার বর্গ এলাকা পরীক্ষা করা হয়। তারা কেবল ভূমির ওপরের স্তরেই কাজ করেন এবং অন্তত ১১৪টি মৃৎপাত্রসহ নানা ভাঙা উপকরণের সন্ধান পান। পাশাপাশি ষাটের দশকের করোনা স্পাই চিত্র এবং ম্যাগনেটোমেট্রি প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাটির নিচে থাকা কাঠামো ও ধাতব বস্তু শনাক্ত করা হয়।
পরবর্তীতে খনন কাজ শুরু হলে মিলতে থাকে আরও নিদর্শন। ধাতু গলানোর পাত্র, স্লাগ এবং বিভিন্ন সামগ্রী থেকে বোঝা যায় এখানে টিন ব্রোঞ্জ উৎপাদনের পরিমাণ হয়তো আরও বৃহত্তর ছিল। তবে সকল গবেষক এই স্থাপনাকে বড় নগরী হিসেবে দেখতে প্রস্তুত নন। এক বিশেষজ্ঞের মতে, মাটির ওপরে পাওয়া তুলনামূলক কম মৃৎপাত্র নগর জনবসতির সাধারণ চিত্রের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
গবেষকেরা পাল্টা যুক্তি হিসেবে বলেন, প্রতি শীতে কয়েক ফুট তুষারের নিচে জমি শক্ত হয়ে থাকে, ফলে মাটির নিচে আরও বহু নিদর্শন অদেখা থেকে যেতে পারে। তাই কেবলমাত্র মৃৎপাত্রের সংখ্যা দিয়ে নগরীর ঘনবসতির ধারণা সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা ঠিক হবে না।
আরও গবেষণার মাধ্যমে তারা জানতে চান সেমিয়ার্কা কতদিন টিকে ছিল, কত মানুষ সেখানে বাস করত এবং এর সঙ্গে আশপাশের অঞ্চলের সম্পর্ক কেমন ছিল। বর্তমানে অন্তত ১৫টি স্থাপনার চিহ্ন পাওয়া গেছে, যার কয়েকটির অভ্যন্তরীণ কক্ষের উপস্থিতি নির্দেশ করে যে সেগুলো ছিল আবাসিক স্থাপনা।
গবেষকদের মতে, এই স্থাপনার বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য আমাদের মধ্য এশিয়ার প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা পরিবর্তন করতে বাধ্য করবে। তারা আশা করেন দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা সেমিয়ার্কার রাজনৈতিক কাঠামো, ধাতু উৎপাদন এবং নগরজীবনের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরবে।



