চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিক আয় প্রতিবেদনে আবারও অসাধারণ সাফল্য দেখা গেলেও শেয়ারবাজারে উল্টো তার শেয়ারের দর কমেছে। কারণ অনেক বিনিয়োগকারী মনে করছেন যে তারা সম্ভবত একটি আসন্ন এআই বুদবুদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন যা হঠাৎ করে ফেটে যেতে পারে।
তবে এআইতে দৃঢ়বিশ্বাসী বিশ্লেষক ও বিনিয়োগকারীদের মতে এই পতন কোনো উদ্বেগের কারণ নয়। বরং তাদের দৃষ্টিতে এটি প্রমাণ করে যে এআই খাতের অগ্রযাত্রা এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে এবং গতি কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
সম্প্রতি এক নোটে ওয়েডবুশ সিকিউরিটিজের এক বিশ্লেষক লিখেছেন যে এআই বুদবুদের ভয় বাস্তবতার তুলনায় অনেক বেশি বাড়িয়ে বলা হচ্ছে। ওই বিশ্লেষকের মতে চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের আয়ের রিপোর্ট এআই বিপ্লবের আরেকটি নিশ্চিত প্রমাণ এবং এই খাত এখনো খেলার শুরুর এক পর্যায়ে অবস্থান করছে।
গত কয়েক বছর ধরেই প্রযুক্তিখাত ও ওয়াল স্ট্রিটে সম্ভাব্য এআই বুদবুদ নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল। কিন্তু এ বছর সেই শঙ্কা আরও তীব্র হয়েছে। বিশাল অঙ্কের এআই অবকাঠামো বিনিয়োগ, কয়েকটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নিজেদের মধ্যে ক্রমাগত চুক্তিবদ্ধ হওয়া এবং লাভের তুলনায় অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রচারণা এসবই কিছু বিনিয়োগকারীর মনে ডটকম যুগের মতো সম্ভাব্য ধসের স্মৃতি জাগিয়ে তুলেছে।
এই মুহূর্তে শীর্ষস্থানীয় দশটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের দখলে রয়েছে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের প্রায় চল্লিশ শতাংশ বাজারমূল্য। এর মধ্যে রয়েছে এআই-কেন্দ্রিক বিনিয়োগে ব্যস্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠান যেমন আমাজন, অ্যালফাবেট, মেটা, ওরাকল এবং মাইক্রোসফট।
ঝুঁকির পরিমাণও কম নয়। ডটকম বুদবুদের পতন ২০০১ সালের মন্দার অন্যতম কারণ ছিল এবং এর ফলে নাসডাক সূচকের মূল্য প্রায় পঁচাত্তর শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।
তবে অভিজ্ঞ বিশ্লেষকদের একটি অংশ বলছেন বিনিয়োগকারীদের এখনো এআই খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো উচিত। তাঁদের মতে ডটকম যুগের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির মূল পার্থক্য হচ্ছে তখনকার অনেক প্রতিষ্ঠান লাভজনক ব্যবসা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছিল। এর ব্যতিক্রম ছিল মাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বর্তমান সময়ের এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশিরভাগই ইতোমধ্যে শক্তিশালী ব্যবসায়িক মডেল প্রতিষ্ঠা করেছে অথবা লাভে পৌঁছানোর জন্য স্পষ্ট ও কার্যকর পথ নির্ধারণ করেছে।
এক শীর্ষস্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্লোবাল ইনকাম বিভাগ প্রধান সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে ডটকম যুগ আমাদের শিক্ষা দিয়েছে বুদবুদ তৈরি হয় এবং ফেটে যায়। তবে তাঁর দৃষ্টিতে বর্তমান এআই খাত সেই অবস্থায় নেই।
এক শীর্ষ ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠাতা জানান যে এআইয়ের মাধ্যমে বর্তমান সময়ে যে রাজস্ব বৃদ্ধির ধারা দেখা যাচ্ছে তা পূর্ববর্তী কোনো প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের তুলনায় বহুগুণ বেশি। তাঁর ভাষায় এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি এবং এর প্রয়োগক্ষেত্রের বিস্তারের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন।
ইতোমধ্যে কিছু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ক্লাউড সেবা, কোডিং এবং বিজ্ঞাপনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি লক্ষ্য করেছে। ভোক্তাবাজারেও নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় চ্যাটবটভিত্তিক নতুন কেনাকাটা সহায়ক সেবা। তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো এই খরচ ও আয়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবে কি না।
কিছু বিশ্লেষকের মতে এআই খাত এখন একটি দীর্ঘমেয়াদি সুপার সাইকেলের শুরুতে রয়েছে যা দীর্ঘ সময় ধরে উদ্ভাবন, বিনিয়োগ এবং আয়ের নতুন যুগ তৈরি করতে পারে। তাঁদের দৃষ্টিতে এটি বৈশ্বিক অর্থনীতিকেও নতুনভাবে রূপ দিতে পারে।
এক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান কৌশলবিদ সম্প্রতি মন্তব্য করেন যে এআইয়ের এই সুপার সাইকেল বাস্তব বলে মনে হয় এবং এটি অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে তিনি মনে করিয়ে দেন যে বাজারমূল্যায়নে সব ধরনের সম্ভাবনাকে বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠাতার এক মন্তব্য অনুযায়ী এআই খাতে অবশ্যই অতিরিক্ত উত্তেজনা রয়েছে এবং অনেক বিনিয়োগ কেবল গতি দেখে অনুসরণ করছে যা পরবর্তীতে সফল নাও হতে পারে। যদিও তাঁর মতে শিল্পটি নিজে বুদবুদে নেই, বরং এর দ্রুত ও ব্যাপক মূল্যসৃষ্টির ধারা আগের সব প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের তুলনায় আলাদা।



