উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং পারস্পরিক বক্তব্যের তীব্রতার মধ্যেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তুতি এগিয়ে চলেছে বলে জানিয়েছে তেহরান। ইরানের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেছেন, যুদ্ধের আবহ তৈরি হলেও নীরবে কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার কাজ অব্যাহত রয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের প্রধান গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, সংবাদমাধ্যমে সংঘাতের যে চিত্র ফুটে উঠছে, বাস্তবে তার বিপরীতে আলোচনার একটি কাঠামো প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে। যদিও সম্ভাব্য এই আলোচনার বিষয়বস্তু বা রূপরেখা সম্পর্কে তিনি নির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করেননি। তাঁর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন অঞ্চলজুড়ে সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যও পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন, সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে ইরান বেশি আগ্রহী বলে তাঁর ধারণা। একটি মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেন, দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ চলছে এবং সম্ভাব্য সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি এটাও ইঙ্গিত দেন যে, বিকল্প পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত রয়েছে এবং একটি বড় নৌবহর ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বেড়েছে। ইরানের অভ্যন্তরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর পদক্ষেপ এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এসবের পাশাপাশি, ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার সামরিক পদক্ষেপের হুমকি আসায় কূটনৈতিক অচলাবস্থার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিমানবাহী রণতরির নেতৃত্বে একটি বৃহৎ মার্কিন নৌবহর ইরান অভিমুখে পাঠানো হয়েছে, যা সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কা আরও বাড়িয়েছে।
তবে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব স্পষ্ট করেছে যে, তারা আলোচনায় বসতে আগ্রহী, কিন্তু এর জন্য আগে সামরিক হুমকির ভাষা বন্ধ করতে হবে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় রাজি না হলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করতে প্রস্তুত থাকবে। এই বক্তব্য তেহরানে কঠোর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
এরই মধ্যে বিশ্ববাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের নৌ মহড়ার পরিকল্পনাকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়। দুই দিনের এই মহড়ার ঘোষণা আসার পর মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এক বিবৃতিতে সতর্ক করে জানায়, মার্কিন বাহিনী, আঞ্চলিক সহযোগী কিংবা বাণিজ্যিক জাহাজের কাছাকাছি যেকোনো অনিরাপদ বা অপেশাদার আচরণ সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এই সতর্কবার্তার জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, নিজস্ব উপকূলে অবস্থানরত বিদেশি সামরিক বাহিনী ইরানের সশস্ত্র বাহিনীকে কীভাবে নিজেদের এলাকায় অনুশীলন করবে, সে নির্দেশ দেওয়ার চেষ্টা করছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, যাকে যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে, সেই বাহিনীর কাছেই আবার পেশাদার আচরণের দাবি জানানো হচ্ছে, যা দ্বিচারিতার শামিল।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ২০১৯ সালে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, এই অঞ্চলে বিদেশি শক্তির সামরিক উপস্থিতি বরাবরই ঘোষিত উদ্দেশ্যের বিপরীত ফল বয়ে এনেছে এবং উত্তেজনা কমানোর বদলে পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করেছে।
তেহরান থেকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও নাজুক পর্যায়ে রয়েছে। তবে জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের প্রধানের আলোচনার অগ্রগতির ইঙ্গিতকে তিনি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কূটনৈতিক তৎপরতা এখনো থেমে নেই এবং সরাসরি সংঘাত এড়াতে ইরান মিত্র দেশগুলোর সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখছে।



