Sunday, November 30, 2025
spot_img
Homeআন্তর্জাতিকইসরায়েল কি জাতিসংঘে টিকে থাকতে পারবে

ইসরায়েল কি জাতিসংঘে টিকে থাকতে পারবে

ইসরায়েল জাতিসংঘের সদস্যপদ হারাতে পারে কি না, সেই প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে। জাতিসংঘ সনদের ৫ ও ৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো রাষ্ট্র সনদের মূলনীতি ধারাবাহিকভাবে লঙ্ঘন করলে তার সদস্যপদ স্থগিত বা বহিষ্কার করা সম্ভব। তবু নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো এই প্রক্রিয়াকে প্রায় অকার্যকর করে তুলেছে। গাজায় সাম্প্রতিক গণহত্যার অভিযোগ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করা এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ওপর হামলার প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশ ও সংগঠন আবারও এই দাবিকে সামনে এনেছে। প্রতিষ্ঠার ৭৫ বছর পর ইসরায়েলের জাতিসংঘ সদস্যপদ টিকে থাকবে কিনা, তা নিয়ে আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।

২০২৫ সালের ২৪ নভেম্বর চিলির কয়েকটি নাগরিক সংগঠন জাতিসংঘ থেকে ইসরায়েলকে বহিষ্কারের জন্য প্রচারাভিযান শুরু করে। তারা সনদের ৬ নম্বর অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করে জানায়, ইসরায়েল ধারাবাহিকভাবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও জাতিসংঘের একাধিক প্রস্তাবনা উপেক্ষা করছে। গাজায় চলমান মানবিক বিপর্যয় তাদের এই দাবিকে আরও জোরালো করেছে।

অনুচ্ছেদ ৬ এর ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো সদস্যরাষ্ট্র সনদের নীতি নিয়মিত লঙ্ঘন করলে নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশে সাধারণ পরিষদ তাকে বহিষ্কার করতে পারে। তবে এই ক্ষমতা ব্যবহার কখনো বাস্তবায়িত হয়নি। গত সেপ্টেম্বরে কাতারে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ গোষ্ঠীর নেতাদের লক্ষ্য করে ইসরায়েলের হামলার পর পাকিস্তানও সদস্যপদ স্থগিত বা বহিষ্কারের দাবি তোলে। পাকিস্তানের জাতিসংঘ প্রতিনিধি সতর্ক করেন যে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।

ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানবাধিকার লঙ্ঘন সংক্রান্ত জাতিসংঘের বিশেষ দূতও বহুবার ইসরায়েলের সদস্যপদ স্থগিতের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা এবং জাতিসংঘ স্থাপনায় হামলার মাধ্যমে সনদ ভঙ্গ করেছে। একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন যে ইসরায়েল জাতিসংঘকে অবমূল্যায়ন করে তাকে সন্ত্রাসী সংগঠন বলেও আক্রমণ করেছে।

ইতিহাসে ইসরায়েলকে বহিষ্কারের বেশ কয়েকটি চেষ্টা হয়েছিল কিন্তু সফল হয়নি। ১৯৭৫ সালে আলজেরিয়া ও সিরিয়ার যৌথ উদ্যোগটি যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর হুমকিতে থেমে যায়। সে সময় বিকল্প পথে ইসরায়েলকে বিচ্ছিন্ন করতে সাধারণ পরিষদের মাধ্যমে প্রস্তাব ৩৩৭৯ গৃহীত হয়, যেখানে জায়নিজমকে বর্ণবাদী বৈষম্যের রূপ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর আরও কয়েক দফা প্রচেষ্টা হয়, বিশেষত মুসলিম দেশসমূহ এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষ থেকে, কিন্তু প্রয়োজনীয় দুই তৃতীয়াংশ ভোট তারা পায়নি।

২০১৮ সালে ইসরায়েলের নেশন স্টেট বিল পাসের পর ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ নতুন করে বহিষ্কারের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ তহবিল বন্ধের হুমকি দিলে সেটিও থেমে যায়। এসব অভিজ্ঞতা বলে যে আইনি ভিত্তি থাকলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা ইসরায়েলকে রক্ষা করে এসেছে।

নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো বড় বাধা। শুধু ইসরায়েল ইস্যুতেই দেশটি ৫১ বার ভেটো প্রয়োগ করেছে। ফলে সাধারণ পরিষদের কাঠামোর মধ্যেই কার্যকর পথ খোঁজার সুযোগ বেশি। ২০২৪ সালে সাধারণ পরিষদ ফিলিস্তিনকে পূর্ণ সদস্যপদ দেওয়ার পক্ষে ব্যাপক সমর্থন প্রদর্শন করে। একই বছর ইসরায়েলের দখলদারি অবসানের দাবিতেও একাধিক প্রস্তাব গৃহীত হয়। এসব ফলাফল দেখায় যে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক মতামত শক্তিশালী হচ্ছে।

গাজা ও পশ্চিম তীরে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, বাস্তুচ্যুতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা অবকাঠামো ধ্বংস, সাতটি দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন এবং অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ আন্তর্জাতিক মহলে ক্ষোভ বাড়িয়েছে। এমনকি দক্ষিণ আফ্রিকার উদাহরণ অনুসরণ করে ইসরায়েলের প্রতিনিধিদলের পরিচয়পত্র বাতিলের পথও সাধারণ পরিষদ ব্যবহার করতে পারে এবং এতে সফলতার সম্ভাবনা আগের চেয়ে বেশি।

এ ছাড়া ইউনাইটিং ফর পিস প্রস্তাব ব্যবহারের সুযোগও রয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদ ভেটোতে অচল হলে সাধারণ পরিষদ বিশেষ জরুরি অধিবেশন ডেকে শান্তির জন্য হুমকি সৃষ্টিকারী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও বৈশ্বিক চাপ বাড়ছে। এ অবস্থায় জাতিসংঘের সদস্যপদ স্থগিত বা বহিষ্কারের দাবি শুধু নৈতিক নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনের ওপরও দাঁড়িয়ে আছে। ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করতে এবং ইসরায়েলকে আইনি ও কূটনৈতিকভাবে জবাবদিহির মুখোমুখি করতে এই দাবি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments