ফিলিস্তিনের গাজায় চলমান ইসরায়েলি অভিযানের বিরুদ্ধে গতকাল শনিবার ইউরোপের বিভিন্ন শহরে লাখো মানুষের বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি বারবার লঙ্ঘিত হওয়ায় বিক্ষোভকারীরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কড়া বৈশ্বিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক ফিলিস্তিন সংহতি দিবসকে কেন্দ্র করে এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়, তবে যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় হামলা চলতে থাকায় কেন্দ্রীয় ইস্যু হিসেবে উঠে আসে ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উপত্যকায় ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে গতকাল প্রধান সড়কজুড়ে প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন। বিক্ষোভকারীরা ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে নিয়ে ‘গাজা, গাজা; প্যারিস তোমার সঙ্গে’ এবং ‘প্যারিস থেকে গাজা, প্রতিরোধ’ স্লোগান তোলেন। তাঁরা ইসরায়েলি অভিযানের কঠোর সমালোচনা করে এটিকে জাতিসংঘ নির্ধারিত মানবাধিকারের মৌলিক নীতির লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেন। এক বিক্ষোভকারী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং ন্যায়বিচার এখনো অনেক দূরে। আরেকজন প্রশ্ন তোলেন, সাধারণ মানুষ যখন অন্যায় স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে, তখন ক্ষমতাধররা কেন তা দেখতে পান না।
ফ্রান্স প্যালেস্টাইন সলিডারিটি অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান পদাধিকারী জানান, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার সাত সপ্তাহ পরও বাস্তব পরিস্থিতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। তাঁর ভাষায়, যুদ্ধবিরতি কার্যত একটি প্রহসনে পরিণত হয়েছে এবং ইসরায়েল প্রতিদিন এই সমঝোতা ভঙ্গ করছে, একই সঙ্গে মানবিক সহায়তা বাধাগ্রস্ত করছে। প্রায় ৮০টি বেসরকারি সংস্থা, ইউনিয়ন এবং রাজনৈতিক দল এই বিক্ষোভের আয়োজন করে, যার অন্যতম ছিল ফ্রান্স প্যালেস্টাইন সলিডারিটি অ্যাসোসিয়েশন।
যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনেও বড় ধরনের প্রতিবাদ অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজকদের দাবি, প্রায় এক লাখ মানুষ এই বিক্ষোভে অংশ নেন। তাঁরা গাজায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান এবং অবরুদ্ধ উপত্যকার ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষের সুরক্ষা দাবি করেন।
ইতালিতেও গাজা যুদ্ধের প্রতিবাদে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে ওঠে। রোমে আয়োজিত প্রধান সমাবেশে জাতিসংঘের অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টার এবং আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত এক জলবায়ু আন্দোলনকর্মী উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ র্যাপোর্টার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে অভিযোগ করেন, গাজার পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীরেও ইসরায়েল জাতিগত নিধন চালাচ্ছে।
এ ছাড়া জেনেভা, লিসবনসহ ইউরোপের আরও কয়েকটি শহরেও বড় বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ৩৪৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত ও ৮৮৯ জন আহত হয়েছেন। এই সময়ে ইসরায়েল প্রায় পাঁচশ বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব এক বিবৃতিতে বলেন, বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, বারবার জনগণকে বাস্তুচ্যুত করা এবং মানবিক সহায়তা বাধাগ্রস্ত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও সতর্ক করেছে যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা সত্ত্বেও গাজায় এখনো নতুন করে হামলা চালানো হচ্ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ ত্রাণ প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।



