Sunday, January 4, 2026
spot_img
Homeইমিগ্রেশন তথ্যআশ্রয়হীনতার ভয়ে ইরানি ধর্মান্তরিতদের ফিরিয়ে দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

আশ্রয়হীনতার ভয়ে ইরানি ধর্মান্তরিতদের ফিরিয়ে দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

মধ্য অক্টোবরের এক সোমবার, টেক্সাসের একটি অভিবাসী আটককেন্দ্রে প্রায় এক বছর ধরে বন্দি থাকা ইরানি নাগরিক মাজিদের কাছে হঠাৎ করেই কর্মকর্তারা উপস্থিত হন। তারা কোনো অতিরিক্ত ব্যাখ্যা ছাড়াই জানান যে তাকে অন্যত্র সরানো হবে। অথচ পাঁচ মাস আগে একজন অভিবাসন বিচারক তাকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার না করার সুরক্ষা দিয়েছিলেন। হাত, কোমর এবং পা শিকলে বাঁধা অবস্থায় তাকে রাতভর নিয়ে যাওয়া হয় লুইজিয়ানার একটি সামরিক বিমানঘাঁটিতে।

মাজিদ, যার প্রকৃত নাম প্রকাশ করা হয়নি, ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে ইরান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে আসেন। মাহসা আমিনি আন্দোলনে অংশ নেয়া এবং পরবর্তী সময়ে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের কারণে তাকে দেশে একাধিকবার আটক ও নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার ভয়েই তিনি আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন।

বিমানঘাঁটিতে তাকে যখন আরেকটি বিমানে তোলা হয়, তখন দেখেন যাত্রীদের মধ্যে তিনিই একমাত্র অ–ল্যাটিন আমেরিকান। বিমানটি ম্যানাগুয়া পৌঁছানোর পর তাকে হাতকড়া পরানো হয়, আশ্রয় আবেদন গ্রহণ করা হয়নি এবং ভেনেজুয়েলা ও তুরস্ক হয়ে ইরানে ফেরার একটি রুট ধরতে বলা হয়। তার কাছে এটি ছিল জোরপূর্বক প্রত্যাবাসনের নির্দেশ।

ইস্তানবুল পৌঁছে তিনি গোপনে আত্মগোপনে চলে যান। সেখানে তিনি ভয়ে দিন কাটাচ্ছেন, কারণ দেশে ফেরত পাঠানো হলে তাকে হয়তো কারাভোগ বা আরও খারাপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। মাজিদের মতো আরও কয়েকজন ইরানি খ্রিস্টান ধর্মান্তরিত যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় আবেদন করেও গত এক বছরে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। অনেকে পরিচয় গোপন রেখে বিবিসিকে জানান যে আশ্রয় যাচাই প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ ও ঝুঁকি মূল্যায়নে অসঙ্গতি রয়েছে। এমনকি তাদের সংবেদনশীল ধর্মীয় তথ্য কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে তা নিয়েও উদ্বেগ আছে।

এ পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির কিছু অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রায়ই বিদেশে খ্রিস্টানদের নিপীড়ন নিয়ে বক্তব্য দিয়ে আসছেন এবং নাইজেরিয়ায় ধর্মীয় নিপীড়ন বন্ধ না হলে কঠোর হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন।

হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা বিবিসিকে জানান যে যাদের বহিষ্কার করা হয়েছে তাদের আশ্রয় আবেদন সম্পূর্ণভাবে বিচার করা হয়েছিল। সাম্প্রতিক যে কয়েকজনকে ইরানে পাঠানো হয়েছে তারা চূড়ান্ত বহিষ্কার আদেশপ্রাপ্ত ছিলেন অথবা স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার আবেদন করেছিলেন বলে কর্মকর্তার দাবি। তিনি আরও জানান, আইনগত কারণে কোনো আবেদনকারীকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে কি না তা প্রকাশ করা যায় না।

অনন্য একটি বহিষ্কার অভিযান

অবৈধ অভিবাসন দমনে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর তৎপরতার অংশ হিসেবে ইরানি আশ্রয়প্রার্থীদের বিষয়ে নীতিতে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে কর্তৃপক্ষ কাতার হয়ে ইরানের উদ্দেশে একটি চার্টার ফ্লাইট পাঠায়, যা গত কয়েক দশকে প্রথম। দুই দেশের কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও এটি ছিল এক বিরল সমন্বয়। বেশ কয়েকজন ইরানিকে শিকলে বাঁধা অবস্থায় বিমানটিতে তোলা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

একজন ফেরত পাঠানো নাগরিক বলেন যে কাতার থেকে তেহরানগামী ফ্লাইটে অস্ত্রধারী নিরাপত্তা সদস্যরা তাদের পাহারা দিচ্ছিলেন। তেহরান পৌঁছে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে কাটানো সময় এবং ধর্মীয় কার্যকলাপ নিয়ে। তবে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

এই ফ্লাইটে ছিলেন আলি নামে পরিচিত একজন ইরানি ধর্মান্তরিতের স্ত্রীও। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত এই ব্যক্তি জানান যে ইরানি গোয়েন্দা বিভাগ পরবর্তীতে তার স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং তাকে তলবও করেছে। তার আইনজীবীর অভিযোগ, ধর্মান্তর গ্রহণসহ সংবেদনশীল তথ্য তাদের নথি থেকে বাদ দেওয়া হয়নি, যা ফেরত পাঠানোদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করেছে।

কেন ইরানি ধর্মান্তরিতদের জন্য ফেরত যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংগঠন আর্টিকেল ১৮ এর তথ্য অনুযায়ী, ইরানে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশই ইসলাম থেকে ধর্মান্তরিত। সরকারি চার্চগুলোতে কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘরোয়া চার্চ গড়ে উঠেছে। কিন্তু এসব ধর্মীয় চর্চা এখনও বাধার মুখে।

ইরানে ইসলাম থেকে ধর্মান্তরিত হওয়াকে ধর্মত্যাগ হিসেবে দেখা হয়, যার শাস্তি হতে পারে গ্রেপ্তার, জিজ্ঞাসাবাদ এবং কারাদণ্ড। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এমন গ্রেপ্তারের সংখ্যা ছয় গুণ বেড়েছে। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষিতে ইরান সরকার অনেক ধর্মান্তরিতকে ইসরায়েলের গুপ্তচর হিসেবে প্রচার করছে বলে অভিযোগ আছে।

অসম বাস্তবতা, ভাঙাচোরা পরিবার

একই পরিবারের সদস্যদের আশ্রয় আবেদনেও ভিন্ন ফল পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। লস অ্যাঞ্জেলেসে মারজান ও রেজা নামে এক দম্পতিকে অভিবাসন কর্মকর্তারা আলাদা আলাদা আটক করেন। দুজনই ইরানি ধর্মান্তরিত এবং যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় চেয়েছিলেন। কয়েক সপ্তাহ পর দেখা যায় মারজানকে ক্যালিফোর্নিয়ায় আশ্রয় দেওয়া হলেও রেজাকে নিউ মেক্সিকো থেকে তৃতীয় দেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

পাদরি আরা টোরোসিয়ান, যিনি তাদের গ্রেপ্তারের ভিডিও ধারণ করেন, জানান যে দম্পতি বৈধভাবে দেশে প্রবেশ করেছিলেন এবং কাজ করার অনুমতিও ছিল। তার প্রশ্ন, স্ত্রী নিরাপদ হতে পারেন, কিন্তু স্বামী কেন হুমকির বিষয় বিবেচিত হলেন?

মাজিদ বর্তমানে তুরস্কে আত্মগোপনে রয়েছেন। তার স্ত্রী ও দেড় বছরের মেয়ের সঙ্গে তিনি এখনো দেখা করতে পারেননি। আলি নামের আরেক ধর্মান্তরিত যুক্তরাষ্ট্রে এক বন্ধুর বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন এবং আশ্রয়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন। কিন্তু তার স্ত্রী ইতোমধ্যেই ইরানে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং আবারও গোয়েন্দা বিভাগ তাকে ডেকেছে।

আলির কথায় স্পষ্ট হতাশা। তিনি বলেন, তাকে আশ্রয় দেওয়া হলেও স্ত্রী ইরানে থাকলে তিনি স্বস্তিতে থাকতে পারবেন না। আর তিনি নিজে ফেরত গেলে কারাদণ্ডের আশঙ্কা রয়েছে।

এমন অনিশ্চয়তায় অনেকেই কাজ করতে পারছেন না, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারছেন না এবং দিনের পর দিন গির্জা বা পরিচিতদের সাহায্যে কোনোভাবে জীবন ধারণ করছেন। তাদের ভবিষ্যৎ এখনো অন্ধকারে ঢেকে আছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments