যুক্তরাষ্ট্রের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ বছর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ভিসা আবেদন প্রক্রিয়ায় জটিলতা এবং সাম্প্রতিক অভিবাসন নীতির প্রভাব মিলিয়ে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আগমনে তীব্র ধস নেমেছে।
সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শরৎ সেশনে নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় কমেছে প্রায় ১৭ শতাংশ। ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন প্রকাশিত এই প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১১ বছরের মধ্যে এটি সবচেয়ে বড় পতন, যেখানে মহামারীকালীন সময়ের বাইরে এত বড় ধস আর দেখা যায়নি। এর আগে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে নতুন আন্তর্জাতিক ভর্তিতে ৭ শতাংশ হ্রাস রেকর্ড করা হয়েছিল।
দেশজুড়ে ৮২৫টি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি স্ন্যাপশট রিপোর্টে দেখা গেছে, অর্ধেকেরও বেশি প্রতিষ্ঠানই জানিয়েছে তাদের নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা কমে গেছে। ওপেন ডোর্স প্রতিবেদন অনুসারে এই পতন প্রায় সর্বত্র একই চিত্র তুলে ধরছে।
আন্তর্জাতিক শিক্ষা সংশ্লিষ্ট একটি বড় সংগঠনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো সেই কেন্দ্রীয় গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা পড়তে আসতে আগ্রহী ছিল। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং সাক্ষাৎকারের সময়ে অস্বাভাবিক বিলম্ব যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, জরিপে অংশ নেওয়া ৯৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠানই জানিয়েছে ভিসা আবেদনসংক্রান্ত বাধা এখন নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির সবচেয়ে বড় অন্তরায়। ভিসা জটিলতা নতুন নয়, তবে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের সাত শতাংশ পতনের পেছনেও ভারত ও সাব সাহারান আফ্রিকার মতো অঞ্চল থেকে ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার বেশি থাকার বিষয়টি ভূমিকা রেখেছিল।
এ বছরের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে চলতি প্রশাসনের সিদ্ধান্ত, যেখানে মে মাসে নতুন শিক্ষার্থী ভিসার সাক্ষাৎকার সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। এতে আবেদন জমা নেওয়ার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের জট তৈরি হয়, যার প্রভাব পড়েছে হাজারো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর ওপর।
শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয়, এই সংকট যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিসরে বড় ধরনের অভিঘাত তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ক সংগঠনটির এক পৃথক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তিতে পতনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১.১ বিলিয়ন ডলার।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে অবদান রেখেছিল প্রায় ৪৩ বিলিয়ন ডলার এবং তাদের উপস্থিতিতে সৃষ্ট বা সমর্থিত চাকরির সংখ্যা ছিল তিন লাখ পঞ্চান্ন হাজারের বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা শুধু টিউশন ফি দিয়ে নয়, বরং স্থানীয় অর্থনীতিতে বহুমুখী প্রভাব ফেলে থাকে। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের এলাকায় বাসা ভাড়া নেন, পণ্য ও সেবা কেনাকাটা করেন, স্বাস্থ্যবীমা কিনেন এবং পর্যটন ব্যয়ের মাধ্যমে স্থানীয় ব্যবসায়িক খাতকে সমর্থন করেন। তাদের হিসাব অনুযায়ী, গড়ে প্রতি তিনজন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রে কমপক্ষে একটি চাকরি সৃষ্টি বা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হলেও সাম্প্রতিক নীতিগত পরিবর্তন এবং ভিসা প্রক্রিয়ার জটিলতায় সেই অবস্থান যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে তা এ বছরের ভর্তি সংকট স্পষ্ট করে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি পরিস্থিতি দ্রুত না বদলায় তবে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা খাত এবং অর্থনীতির ওপর আরো গভীর হতে পারে।



