Saturday, January 3, 2026
spot_img
Homeএডুকেশনআদ্যোপান্ত পাঠদক্ষতায় পিছিয়ে মাধ্যমিক শিক্ষার্থীরা

আদ্যোপান্ত পাঠদক্ষতায় পিছিয়ে মাধ্যমিক শিক্ষার্থীরা

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পাঠদক্ষতা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যে উদ্বেগ বাড়ছে, তা আরও স্পষ্ট হয়েছে বিভিন্ন শিক্ষা বিশেষজ্ঞের মতামত ও সমীক্ষায়। প্রায় এক বছর আগে একটি অনলাইন সম্মেলনে কিশোর শিক্ষার্থীদের পাঠদক্ষতা নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হলে অংশগ্রহণকারীদের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে প্রশ্নোত্তর পর্বে উঠে আসে একটি বাস্তবসম্মত উদ্বেগ। অনেক শিক্ষক জানান, তাদের শিক্ষার্থীরা এতটাই পিছিয়ে আছে যে সাহিত্য বিশ্লেষণ বা বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ শেখানোর সূক্ষ্ম বিষয়গুলো ভাবার সুযোগ নেই। বরং তাদের মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের প্রাথমিকভাবে পড়তে সক্ষম করে তোলা।

শিক্ষকরা বারবার প্রশ্ন তুলেছিলেন, “তথ্যগুলো ভালো, কিন্তু যখন একজন শিক্ষার্থী তিন বা চার শ্রেণি পেছনে থাকে, তখন তার জন্য কী করণীয়?” এই প্রশ্নগুলো শিক্ষাবিষয়ক প্রতিবেদনের দায়িত্বে থাকা সম্পাদকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি লক্ষ্য করেন, অল্প কিছু তথ্য ছাড়া মাধ্যমিক স্তরের পাঠদক্ষতার প্রকৃত চিত্র সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য উপাত্ত খুবই সীমিত। রাজ্যভিত্তিক পরীক্ষার ফলাফল ছাড়া আর কোন উৎস নেই এবং ওই ফলাফলও নির্ণয়মূলক নয়। ফলে জানা যায় না শিক্ষার্থীরা কোন নির্দিষ্ট বিষয়ে সমস্যায় ভুগছে।

সমীক্ষায় দেখা যায়, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের পাঠদক্ষতার সমস্যা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে। মোট অংশগ্রহণকারী শিক্ষককের মধ্যে ৫৮ শতাংশ জানান, তাদের শ্রেণির অন্তত এক চতুর্থাংশ শিক্ষার্থী মৌলিক পাঠদক্ষতায় সমস্যায় পড়ে।

এদিকে দেশজুড়ে ৪০টি রাষ্ট্র প্রাথমিক স্তরের পাঠপঠন উন্নয়নে নতুন নীতি গ্রহণ করলেও সেগুলোর বেশির ভাগই কেবল কেজি থেকে তৃতীয় কিংবা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। মাধ্যমিক স্তরের পাঠদক্ষতার বিশেষ প্রয়োজনগুলোকে এসব নীতিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। অথচ এই পর্যায় থেকেই বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান বাড়তে থাকে এবং শিক্ষার্থীদের অধিকাংশ তথ্য পাঠ্যবই পড়েই আয়ত্ত করতে হয়। বিভিন্ন বিষয়ে প্রয়োজন হয় ভিন্ন ধরনের পাঠবোঝাপড়া। সাহিত্য বিশ্লেষণ এবং বিজ্ঞানের মতো শাখাগুলো শিক্ষার্থীদের আলাদা ধরনের পাঠদক্ষতা দাবি করে।

এ অবস্থার কারণ হিসেবে শিক্ষকরা মূলত দুটি বিষয় তুলে ধরেছেন। প্রথমটি হলো অনীহা এবং দ্বিতীয়টি হলো সীমিত সাবলীলতা। প্রায় এক চতুর্থাংশ শিক্ষক শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণার অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন। পাঁচ জনে একজন বলেছেন, শিক্ষার্থীদের সাবলীল পাঠ ক্ষমতা কম। ফলে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পড়তে পারে না।

আজকের শিক্ষার্থীদের বই পড়ার প্রবণতা কমে যাওয়ার বিষয়টি বিভিন্ন পরিসংখ্যানে প্রতীয়মান হয়েছে। পড়ার পরিমাণ কম হলে পাঠদক্ষতা উন্নত হওয়ার সুযোগও কমে যায়। স্মার্টফোন ও ডিজিটাল স্ক্রিনের ব্যবহারও এর একটি সম্ভাব্য কারণ। একই সঙ্গে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের জনপ্রিয় পাঠক্রমে সম্পূর্ণ বইয়ের পরিবর্তে নানা অংশবিশেষ ব্যবহারের প্রবণতাও শিক্ষার্থীদের পড়ার পরিমাণ কমিয়ে দিতে পারে। মাধ্যমিক বয়সে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় স্বাভাবিকভাবেই কম আগ্রহী হয়। এ কারণটিও গুরুত্বপূর্ণ।

সাবলীলতার অভাবের সঙ্গে যুক্ত আরেকটি বিষয় হলো শব্দভিত্তিক দুর্বলতা। শব্দ ডিকোড করার অসক্ষমতা, বিশেষ করে বহু-সিলেবিক শব্দ পড়তে না পারা, অনেক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে বড় বাধা। মাধ্যমিক স্তরের বিষয়ভিত্তিক পাঠ্যবইয়ের জটিল শব্দ যেমন পলিনোমিয়াল বা ফটোসিনথেসিস তাদের জন্য বিশেষভাবে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

অন্যদিকে, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়েছে। প্রাথমিক স্তরে পাঠ উন্নয়নের প্রশিক্ষণ থাকলেও বড়দের জন্য পাঠ হস্তক্ষেপ নিয়ে প্রশিক্ষণ খুবই সীমিত। সমীক্ষায় দেখা যায়, মাত্র ৩৮ শতাংশ শিক্ষক এসব শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করার কোনো প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। বাকি এক তৃতীয়াংশ জানান, তারা কোনো প্রশিক্ষণ পাননি। শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে এই বিষয়ে প্রস্তুতিও খুব কম দেওয়া হয়।

এছাড়া প্রাথমিক স্তরের তুলনায় মাধ্যমিক পর্যায়ে অতিরিক্ত পাঠ সহায়তা অনেক কম। অর্ধেকের কিছু বেশি শিক্ষক জানান যে তাদের প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত সহায়তার সময় বা কর্মী রয়েছে। কিন্তু নিবিড় সহায়তা যেমন টিউটরিং সুবিধা পাওয়া আরও কম। বিশেষ করে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে মাত্র এক তৃতীয়াংশ শিক্ষক হস্তক্ষেপমূলক সময় বা স্ক্রিনিং মূল্যায়ন পান যা শিক্ষার্থীর সমস্যার ধরন নির্ণয়ে সাহায্য করে।

সব মিলিয়ে স্পষ্ট যে পাঠদক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ যতটা প্রয়োজন ঠিক ততটা মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছায় না। প্রাথমিক স্তরে সহায়তা বেশি থাকায় ধরে নেওয়া হয় বড় শিক্ষার্থীরাও প্রয়োজনীয় সাহায্য পাচ্ছে, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments