সাধারণভাবে শক্তিশালী কম্পিউটার বলতে আমরা বুঝি দ্রুতগতির কাজ, বড় ফাইলের তাৎক্ষণিক প্রসেসিং কিংবা উন্নত গেমিং সক্ষমতা। তবে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থার কাছে শক্তিশালী কম্পিউটারের সংজ্ঞা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের কাছে এমন একটি ব্যবস্থা প্রয়োজন, যা মানুষের শতাব্দীব্যাপী শ্রমকে নামিয়ে আনতে পারে মাত্র এক দিনের মধ্যে। এই লক্ষ্য সামনে রেখেই সংস্থাটি উন্মোচন করেছে তাদের নতুন প্রজন্মের সুপারকম্পিউটার, যার নাম অ্যাথেনা।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি গবেষণা কেন্দ্রে স্থাপিত এই সুপারকম্পিউটারটি বাহ্যিকভাবে খুব একটা আকর্ষণীয় না হলেও এর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা নজিরবিহীন। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণ কম্পিউটার যেখানে একটি জটিল গণনাভিত্তিক কাজ শেষ করতে প্রায় ৫০০ বছর সময় নেবে, সেখানে অ্যাথেনা সেই কাজ শেষ করতে পারে মাত্র ২৪ ঘণ্টায়। এই বিপুল পারফরম্যান্স পার্থক্যই একে বর্তমান সময়ের অন্যতম শক্তিশালী গবেষণা যন্ত্রে পরিণত করেছে।
অ্যাথেনার সর্বোচ্চ গণনাশক্তি ২০ পেটাফ্লপসেরও বেশি। এক পেটাফ্লপস বলতে বোঝায় প্রতি সেকেন্ডে এক কোয়াড্রিলিয়ন বা একের পরে ১৫টি শূন্যসংখ্যক গণনা সম্পন্ন করার ক্ষমতা। অ্যাথেনা প্রতি সেকেন্ডে এই মাত্রার গণনা করতে পারে প্রায় ২০ বার। ফলে এটি সংস্থার আগের ব্যবহৃত সুপারকম্পিউটার সিস্টেমগুলোর তুলনায় বহুগুণ বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এই নতুন সিস্টেমটি স্থাপন করা হয়েছে একটি মডুলার সুপারকম্পিউটিং সুবিধায়, যেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী হার্ডওয়্যার ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো সহজেই হালনাগাদ করা সম্ভব।
এই মডুলার কাঠামোই অ্যাথেনার অন্যতম বড় সুবিধা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই ব্যবস্থায় পুরো ভবন ভাঙচুর না করেই কুলিং সিস্টেম বা প্রসেসিং ইউনিট পরিবর্তন করা যায়। এর ফলে যেমন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে, তেমনি গবেষণার কাজও বাধাগ্রস্ত হয় না। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের যুগে এই নমনীয়তা ভবিষ্যতের জন্য একটি টেকসই সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অ্যাথেনা কেবল দ্রুতগতিরই নয়, এটি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ীও। উন্নত বাতাস চলাচল ব্যবস্থা ও আধুনিক কুলিং প্রযুক্তির কারণে পুরোনো সিস্টেমের তুলনায় এর বিদ্যুৎ খরচ অনেক কম। এই কম্পিউটার ব্যবহার করা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বড় মডেল প্রশিক্ষণে, যেখানে বিপুল পরিমাণ ডেটা বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয়। একই সঙ্গে পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, জলবায়ু ব্যবস্থার বিশ্লেষণ এবং অ্যারোনটিকস গবেষণার মতো জটিল ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
মহাকাশ অভিযানের ক্ষেত্রে নিখুঁত গণনা অত্যন্ত জরুরি। ভবিষ্যতের চন্দ্রযান অবতরণ, মঙ্গল গ্রহে প্রবেশের কৌশল নির্ধারণ কিংবা গভীর মহাকাশযানের পথ পরিকল্পনায় সামান্য একটি ভুলও কোটি কোটি ডলারের মিশনকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। অ্যাথেনা এই ধরনের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করছে। এটি রকেট উৎক্ষেপণের হাজার হাজার সম্ভাব্য পরিস্থিতির সিমুলেশন চালাতে পারে, যার মাধ্যমে সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর পরিকল্পনা বেছে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
এ ছাড়া পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা গ্রহাণু বা অ্যাস্টেরয়েডের গতিপথ নির্ণয় ও ট্র্যাকিংয়ের মতো অত্যন্ত জটিল কাজেও অ্যাথেনা ব্যবহৃত হচ্ছে। অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে এটি বিজ্ঞানীদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করছে। গবেষকদের মতে, অ্যাথেনা কেবল একটি যন্ত্র নয়; এটি মহাকাশ গবেষণার এমন এক নির্ভরযোগ্য সঙ্গী, যা মানুষের কল্পনার সীমাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং অসম্ভবকে বাস্তবের কাছাকাছি এনে দিচ্ছে।



