Sunday, January 4, 2026
spot_img
Homeসম্পাদকীয়অস্থির আর্থিক নীতিতে সরকারের দিশাহারা পথচলা

অস্থির আর্থিক নীতিতে সরকারের দিশাহারা পথচলা

সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সাম্প্রতিক নাটকীয় আলোচনাগুলো যেমন দৃষ্টি কাড়ছে, তেমনই প্রশ্নও তুলছে নীতিনির্ধারকদের সক্ষমতা ও উদ্দেশ্য নিয়ে। সকালবেলার পত্রিকাগুলোতে যে হৈচৈ ছড়ানো হয়েছে তা মূলত অতিরঞ্জনেরই উদাহরণ। কয়েক বিলিয়ন পাউন্ডের হিসাবভেদকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন এটি যুগের সবচেয়ে বড় প্রতারণা। ভবিষ্যতের অর্থনীতি পূর্বাভাস দেওয়া অত্যন্ত জটিল, তবুও ২০২৯ সালের রাজস্ব কাঠামোকে নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব বলে যে দাবি তোলা হচ্ছে তা সম্পূর্ণই বিভ্রান্তিকর। তাই যেসব শিরোনামে বাজেটের তথাকথিত সংকট বা তদন্তের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো আসলে নিতান্তই দুর্বল নাটক।

অফিস ফর বাজেট রেসপনসিবিলিটি বা ওবিআর কোনো ভবিষ্যদ্বাণীর শক্তিকেন্দ্র নয়। এর সমালোচক ও সমর্থক অনেকেই প্রতিষ্ঠানটিকে এমনভাবে ব্যবহার করছেন যেন এটি সর্বজ্ঞ কোনো মাপকাঠি। বাস্তবে ওবিআর নিজেই স্বীকার করে যে তাদের মধ্যমেয়াদি পূর্বাভাস প্রায়ই ভুল প্রমাণিত হয়। মুদ্রাস্ফীতি থেকে শুরু করে উৎপাদনশীলতা পর্যন্ত বহু ক্ষেত্রেই তারা ভুল অনুমান করেছে, আবার অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে তাদের বিশ্লেষণ ব্যাহত হয়েছে। ২০১৯ সালের পাঁচ বছর মেয়াদি পূর্বাভাস প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি থেকে দুইশ বিলিয়ন পাউন্ড কম ছিল। এমন বড় ধরনের বিভ্রান্তির পরও ২০২৯ থেকে ২০৩০ সালের জন্য নির্ধারিত কুড়ি বিলিয়ন পাউন্ডের রাজস্ব ভারসাম্যকে অপরিবর্তনীয় সত্য ধরে নেওয়া অত্যন্ত অসংগত।

সরকারও এই ভ্রান্ত ধারণায় সমানভাবে ভূমিকা রাখছে। অর্থমন্ত্রী বিভ্রান্তির আশ্রয় না নিলেও সব কিছু স্পষ্টভাবে বলেননি। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এটি ইঙ্গিত করা হয়েছিল যে ওবিআর নাকি নতুন সরকারের উৎপাদনশীলতা নিয়ে অতি কঠোর মূল্যায়ন করেছে। যেন রাষ্ট্রযন্ত্র নতুন সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। বাস্তবে ওবিআরের আরও জরুরি সমস্যা ছিল একটি সাইবার ঝুঁকিপূর্ণ ওয়েবসাইট যেখানে বাজারসংবেদনশীল তথ্য অরক্ষিত ছিল। এই ঘটনার দায়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রধানকে পদত্যাগ করতে হয়েছে।

বর্তমান সরকারের আর্থিক নীতি মূলত সেই নিয়মকে ঘিরে আবর্তিত যা ২০২৯ থেকে ২০৩০ সালে রাজস্ব উদ্বৃত্ত নিশ্চিত করার কথা বলে। এই নিয়ম মূলত বন্ড বাজারকে সন্তুষ্ট করতে তৈরি। অথচ দেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বল, বাণিজ্য ঘাটতি স্থায়ী এবং বেসরকারি বিনিয়োগ কম। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় ঘাটতি ছাড়া অর্থনীতি টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু বাজারের কাছে এটি অগ্রহণযোগ্য, কারণ তাদের কাছে ঘাটতি মানে বেশি বন্ড ইস্যু হয়ে ফলনে চাপ পড়ে। তাই বাজার সব সময় চায় সরকারের কাছে বেশি আর্থিক অবকাশ বা হেডরুম থাকুক। এই পছন্দ অর্থনৈতিক দায়িত্ববোধের নামে উপস্থাপন করা হলেও এর মূল উদ্দেশ্য তাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষা।

অন্যদিকে শাসক দলের সংসদ সদস্যরা সামাজিক খাত বা কল্যাণ খাতে কাটছাঁট চান না এবং ধনীদের ওপর কার্যকরভাবে কর আরোপের পক্ষে। এই অবস্থান অর্থমন্ত্রীর নির্ধারিত সীমাবদ্ধতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে সরকার নিজেই পড়ে গেছে সংসদীয় প্রবণতা ও বন্ড বাজারের দাবি, এই দুইয়ের মাঝে সৃষ্ট অস্থিরতার ফাঁদে।

তবে সমস্যার সমাধান আছে। সরকার চাইলে সুদের ব্যয় কমাতে পারে যা রাজস্ব ঘাটতির বড় অংশ তৈরির জন্য দায়ী। ব্যাংকগুলোর অস্বাভাবিক মুনাফার ওপর কর আরোপ করা যেতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে সুদ প্রদান সীমিত করার যেসব প্রস্তাব এসেছে, তা প্রয়োগ করলে কয়েক বিলিয়ন সাশ্রয় হতে পারে এবং সরকারি ক্ষতি কমবে। আবার পরামর্শ রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং ক্ষতির দায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রত্যাহার করলে প্রতিবছর প্রায় কুড়ি বিলিয়ন পাউন্ড বাড়তি পাওয়া যাবে।

এসব পদক্ষেপ একদিকে বাজেটের ভারসাম্য উন্নত করবে, অন্যদিকে দেশের সামাজিক কাঠামোকেও অক্ষুণ্ণ রাখবে। কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি যা বর্তমানে সরকারের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। ভবিষ্যতের নেতৃত্ব হয়তো বাজারের অযৌক্তিক ভয়ের বাইরে গিয়ে দেশের পুনর্গঠনে আরও সাহসী নীতি গ্রহণ করতে সক্ষম হবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments