Sunday, November 30, 2025
spot_img
Homeআন্তর্জাতিকঅরুণাচল সংকটে নতুন উত্তেজনার ঢেউ

অরুণাচল সংকটে নতুন উত্তেজনার ঢেউ

ভারত ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিনের রোনো দ্বন্দ্ব কমিয়ে সম্পর্কোন্নয়নের প্রচেষ্টা চলছিল। কয়েক মাস ধরে দুই দেশের যোগাযোগ তুলনামূলক শান্ত থাকলেও হঠাৎ আবার উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। মূল কারণ ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশের এক নারীকে চীনে হয়রানির অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন বাগ্বিতণ্ডা।

চীন বহু বছর ধরে দাবি করে আসছে যে অরুণাচল প্রদেশ তিব্বতের দক্ষিণাঞ্চলের অংশ। এই দাবি থেকেই ঐতিহাসিক সীমান্ত বিরোধের সূত্রপাত। সাম্প্রতিক ঘটনার কারণে সেই পুরোনো দ্বন্দ্ব আবার সামনে উঠে এসেছে।

যুক্তরাজ্য থেকে যাত্রা পথে হয়রানি

ভারতের অরুণাচল প্রদেশে জন্ম নেওয়া এক নারী যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন। তিনি ভারতীয় পাসপোর্ট নিয়ে যুক্তরাজ্য থেকে জাপানের উদ্দেশ্যে রওনা হন। তিন ঘণ্টার ট্রানজিটে তিনি চীনের সাংহাই পুডং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামেন। সেখানেই তাঁকে আটক করে প্রায় ১৮ ঘণ্টা ধরে হয়রানি করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

তিনি জানান, বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা তাঁকে আটক করার সময় বলেন যে অরুণাচল প্রদেশ চীনের অংশ, ফলে তাঁর ভারতীয় পাসপোর্ট বৈধ নয়। তাঁর প্রতিবাদ সত্ত্বেও তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ ও চাপের মুখে পড়তে হয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, কর্মকর্তারা তাঁকে চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইনের টিকিট কিনতে বলেছিলেন এবং সেই দাবিই পাসপোর্ট ফেরতের শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। এতে তাঁর অতিরিক্ত আর্থিক ক্ষতিও হয়।

পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়লে যুক্তরাজ্যে থাকা তাঁর এক বন্ধু যোগাযোগ করে সহায়তা করার চেষ্টা করেন। পরে তিনি সাংহাইয়ে ভারতীয় কনস্যুলেটের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। কনস্যুলেটের কর্মকর্তারা তাঁকে বিকল্প ফ্লাইটে সাংহাই ছাড়তে সহায়তা করেন। তবে গত অক্টোবরেও তিনি একই বিমানবন্দর দিয়ে ভ্রমণ করলেও কোনো ঝামেলা হয়নি। এবার আচরণটি কেন পরিবর্তিত হলো, তা স্পষ্ট নয়।

অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে পুরোনো সীমান্ত বিরোধ

অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে ভারত ও চীনের বিরোধের ইতিহাস ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল পর্যন্ত যায়। ১৯১৪ সালের সিমলা কনভেনশনে হেনরি ম্যাকমোহনের মধ্যস্থতায় ম্যাকমোহন লাইন নির্ধারিত হয়। এই চুক্তিতে তিব্বত ও ব্রিটিশ শাসকেরা অংশ নিলেও চীনা প্রতিনিধিরা চূড়ান্ত নথিতে সই করেননি এবং বেইজিং ম্যাকমোহন লাইনের বৈধতা স্বীকার করেনি।

চীন দাবি করে যে তিব্বতের একক সিদ্ধান্তে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত নির্ধারণের অধিকার ছিল না। ১৯৫১ সালে তিব্বত দখলের পর এই দাবি আরও জোরালো হয়। পুরোনো মানচিত্র উল্লেখ করে বেইজিং বলে যে ম্যাকমোহন লাইনের দক্ষিণের অঞ্চল চীনের। অন্যদিকে স্বাধীনতার পর থেকেই ভারত এই লাইনকে সীমান্ত হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।

চীন বহু দশক ধরে অরুণাচল প্রদেশের তাওয়াং অঞ্চল দাবি করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পুরো রাজ্যটিকেই নিজেদের বলে দাবি করতে শুরু করেছে। গবেষকদের মতে, চীনা প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এই দাবি আরও তীব্র হয়েছে।

সীমান্তে সংঘর্ষ ও উত্তেজনার ক্রমবৃদ্ধি

অরুণাচল প্রদেশ ১৯৬২ সালের যুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। তাওয়াং অঞ্চল দখল করে পরবর্তীতে ভারতকে ফিরিয়ে দিয়েছিল চীনা বাহিনী। ১৯৭৫ সালে তুলুং লা এলাকায় সংঘর্ষে ভারতীয় সেনা নিহত হন। ২০২০ সালের লাদাখ সংকটের আগপর্যন্ত এটিই ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘর্ষ। এরপর ২০২২ সালে তাওয়াং এলাকায় আরেকটি ছোট সংঘর্ষ ঘটে।

চলতি বছর চীন তিব্বতের মেডং এলাকায় একটি বাঁধ নির্মাণের অনুমতি দেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ভারত অরুণাচল প্রদেশে বন্যা নিয়ন্ত্রণে জলাধার প্রকল্প হাতে নেয়। তবে এতে ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশেরও বহু গ্রাম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

সাম্প্রতিক ঘটনায় দুই দেশের অবস্থান

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, অরুণাচল প্রদেশ তাদের মতে জাংনানের অংশ এবং সেই বিবেচনায় নিয়ম মেনে বিমানবন্দরে আচরণ করা হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, অরুণাচল প্রদেশ ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ, চীনের দাবি বাস্তবতা পরিবর্তন করতে পারে না। পাশাপাশি ওই নারীর আটক নিয়ে চীনের কাছে জোরালো প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।

ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশঙ্কা

দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সফরের মাধ্যমে সম্পর্ক উন্নয়নের যে প্রচেষ্টা চলছিল, সাম্প্রতিক ঘটনা তা আবারও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, অর্থনৈতিক চাপ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দুই দেশকে কিছুটা কাছাকাছি এনেছে, কিন্তু পারস্পরিক কৌশলগত অবিশ্বাস এখনো কাটেনি। তাই সীমান্তের জটিলতা আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments