মহাকাশে মানুষ বংশবৃদ্ধি করতে পারবে?

মানুষ কি একদিন পৃথিবীর বাইরে স্থায়ীভাবে বসবাস করবে? আর যদি করে, তাহলে মহাকাশের মতো প্রতিকূল পরিবেশে মানুষের প্রজনন ও নতুন প্রজন্মের জন্ম সম্ভব হবে কি? এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এক যুগান্তকারী গবেষণায় নেমেছেন চীনের বিজ্ঞানীরা। প্রথমবারের মতো মহাকাশ স্টেশনে পাঠানো হয়েছে মানুষের কৃত্রিম ভ্রূণ মডেল, যার মাধ্যমে মহাশূন্যের পরিবেশে মানব বিকাশের প্রাথমিক ধাপগুলো কীভাবে প্রভাবিত হয়, তা পর্যবেক্ষণ করা হবে।

গবেষকদের মতে, পৃথিবীর অভিকর্ষ বলের বাইরে মানুষের শরীরের কোষ, টিস্যু এবং বিকাশপ্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে কি না, তা বোঝা ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই মানুষের স্টেম সেল থেকে তৈরি বিশেষ ধরনের কৃত্রিম ভ্রূণ মডেল চীনের তিয়াংগং মহাকাশ স্টেশনে পাঠানো হয়েছে। এগুলো তিয়ানঝৌ-১০ নামের একটি কার্গো মহাকাশযানের মাধ্যমে মে মাসের শুরুতে স্টেশনে পৌঁছায়। পুরো গবেষণাটি পরিচালনা করছে চায়নিজ একাডেমি অব সায়েন্সেসের ইনস্টিটিউট অব জুলজির একটি গবেষক দল।

বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, মহাকাশে পাঠানো এই নমুনাগুলো কোনো প্রকৃত মানব ভ্রূণ নয় এবং এগুলো কখনো পূর্ণাঙ্গ মানুষে পরিণত হওয়ার সক্ষমতাও রাখে না। এগুলোকে কৃত্রিম ভ্রূণ মডেল বলা হচ্ছে, যা ল্যাবরেটরিতে মানুষের স্টেম সেল ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। নিষিক্ত ডিম্বাণু থেকে একটি মানব ভ্রূণ যেভাবে ১৪ থেকে ২১ দিনের মধ্যে বিকশিত হয়, এই মডেলগুলো সেই প্রাথমিক ধাপকে অনুকরণ করতে পারে।

গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কোষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিন্যস্ত হতে এবং বিভাজনের মাধ্যমে বৃদ্ধি পেতে সক্ষম। তবে এগুলো কখনো মানবশিশুতে রূপান্তরিত হতে পারে না। এই সীমাবদ্ধতার কারণেই বিজ্ঞানীরা নৈতিক বা আইনি জটিলতা ছাড়াই মানব বিকাশের একেবারে শুরুর স্তর নিয়ে গবেষণার সুযোগ পাচ্ছেন।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট এক গবেষক জানিয়েছেন, মহাকাশে পাঠানো নমুনা এবং পৃথিবীতে সংরক্ষিত একই ধরনের নমুনার বিকাশ তুলনা করে তাঁরা জানতে চান, মহাশূন্যের পরিবেশ মানুষের প্রাথমিক ভ্রূণ বিকাশে কী ধরনের প্রভাব ফেলে। এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশযাত্রা বা ভবিষ্যতের মহাকাশ বসতিতে মানুষের জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা সহজ হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবীর সব প্রাণী কোটি কোটি বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট মাধ্যাকর্ষণ পরিবেশে বিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু মহাকাশে রয়েছে মাইক্রোগ্র্যাভিটি বা অত্যন্ত কম মাধ্যাকর্ষণ এবং উচ্চমাত্রার মহাজাগতিক বিকিরণ। এই দুটি উপাদান মানবদেহের কোষের গঠন, জিনের কার্যক্রম এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বর্তমানে বিভিন্ন দেশ মহাকাশ স্টেশনে দীর্ঘমেয়াদি মানব উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি চাঁদ ও মঙ্গলে স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। সেই প্রেক্ষাপটে মানুষের প্রজনন ও বিকাশ মহাশূন্যে আদৌ সম্ভব কি না, তা জানা অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।

গবেষক দলের প্রধান জানিয়েছেন, তাঁদের অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—মানুষ কি মহাকাশে শুধু বেঁচে থাকতেই নয়, প্রজনন করতেও সক্ষম হবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে মহাকাশে দীর্ঘ সময় অবস্থানকারী মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও চিকিৎসাব্যবস্থা উন্নয়নের পথও উন্মুক্ত হবে।

বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, মাধ্যাকর্ষণের অভাব মানব বিকাশের প্রাথমিক ধাপগুলোতে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটায়, তা পরিষ্কারভাবে বোঝা গেলে সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব প্রতিরোধের উপায়ও বের করা সম্ভব হবে। ফলে এই গবেষণা শুধু মহাকাশবিজ্ঞানেই নয়, মানবজীবনের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।

মানবসভ্যতা যখন পৃথিবীর গণ্ডি পেরিয়ে মহাকাশে নতুন অধ্যায় রচনার স্বপ্ন দেখছে, তখন এই কৃত্রিম ভ্রূণ মডেল গবেষণাকে ভবিষ্যতের মহাজাগতিক বসতির পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed