কাইজেনের ছোট অভ্যাসে বড় পরিবর্তন

জীবন বদলানোর কথা আমরা প্রায়ই ভাবি। অনেকেই সিদ্ধান্ত নিই, আগামীকাল থেকে নিয়মিত ব্যায়াম করব, ভোরে উঠব, বই পড়ব, মোবাইলের ব্যবহার কমাব কিংবা নতুন কোনো দক্ষতা অর্জনে মনোযোগ দেব। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, কয়েক দিন চেষ্টা করার পরই সেই উদ্যম হারিয়ে যায়। এরপর শুরু হয় হতাশা, আত্মসমালোচনা এবং নিজের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ। অথচ সমস্যার মূল কারণ অনেক সময় ইচ্ছাশক্তির অভাব নয়, বরং পরিবর্তনের জন্য ভুল পদ্ধতি বেছে নেওয়া।

জাপানের বহুল আলোচিত ‘কাইজেন’ দর্শন এ জায়গাতেই ভিন্ন একটি দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে। এটি এমন একটি পদ্ধতি, যা জীবনে বড় পরিবর্তন আনার জন্য হঠাৎ বিশাল কোনো পদক্ষেপের ওপর নির্ভর না করে ছোট ছোট উন্নতির ধারাবাহিকতাকে গুরুত্ব দেয়। জাপানি শব্দ ‘কাই’ অর্থ পরিবর্তন এবং ‘জেন’ অর্থ ভালো। অর্থাৎ কাইজেনের মূল অর্থ হলো ভালো কিছুর জন্য ধারাবাহিক পরিবর্তন।

বর্তমান সময়ে বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে দ্রুত সফল হওয়ার প্রবণতা ব্যাপকভাবে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা চারপাশের মানুষের সাফল্য দেখে অনেকেই মনে করেন, বড় অর্জন খুব অল্প সময়েই সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দৃশ্যমান সাফল্যের পেছনে থাকে দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রম, ব্যর্থতা এবং অবিরাম চেষ্টা। মানুষ যেমন এক দিনে হাঁটতে শেখে না, তেমনি জীবনের বড় অর্জনও এক দিনে আসে না।

কাইজেন দর্শন এই বাস্তবতাকেই সামনে আনে। এটি বলে, প্রতিদিন সামান্য উন্নতিও দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে। জাপানি লেখক ইমাই তাঁর বিখ্যাত বইয়ে এই ধারণাকে জনপ্রিয় করে তোলেন। তাঁর মতে, উন্নতি মানে শুধু বড় কোনো সাফল্য নয়; বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট অগ্রগতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের অনেক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে উৎপাদন খাতে, এই দর্শন অনুসরণ করে নিজেদের বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করেছে।

কাইজেনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর বাস্তবতা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কেউ যদি প্রতিদিন এক ঘণ্টা বই পড়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে কয়েক দিনের মধ্যেই তা কঠিন মনে হতে পারে। কিন্তু যদি সে প্রতিদিন মাত্র এক পৃষ্ঠা পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলে, তাহলে সেই কাজ চালিয়ে যাওয়া অনেক সহজ হয়ে যায়। একইভাবে প্রতিদিন পাঁচ মিনিট হাঁটা, অল্প সময় ব্যায়াম করা কিংবা কয়েক লাইন ডায়েরি লেখা দীর্ঘমেয়াদে বড় অভ্যাসে পরিণত হতে পারে।

তবে ছোট পদক্ষেপ নেওয়ার অর্থ এই নয় যে পথ সব সময় সহজ হবে। এমন অনেক দিন আসবে, যখন কোনো কাজ করতে মন চাইবে না। মনে হবে, এত চেষ্টা করেও তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু এই সময়গুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বেশির ভাগ মানুষ শুরুতে ব্যর্থ হয় না; তারা থেমে যায় মাঝপথে। শুরুতে উৎসাহ থাকে, আর শেষে থাকে অর্জনের আনন্দ। মাঝখানের দীর্ঘ পথটিই সবচেয়ে কঠিন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র অনুপ্রেরণার ওপর নির্ভর করলে দীর্ঘমেয়াদে লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে। বরং নিয়মিত ছোট পদক্ষেপ বজায় রাখা বেশি কার্যকর। ব্যর্থতা কিংবা সাময়িক বিরতিকে শেখার অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে পারলে এগিয়ে চলা সহজ হয়। নিজের মূল্যবোধ ও প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে লক্ষ্য নির্ধারণ করলে সেটি দীর্ঘ সময় ধরে ধরে রাখার সম্ভাবনাও বাড়ে।

এ কারণেই কাইজেন দর্শন বলে, যেদিন কাজ করতে ইচ্ছা করবে না, সেদিনও অন্তত সবচেয়ে ছোট কাজটি করে ফেলুন। কারণ, ধারাবাহিকতা ভেঙে গেলে আবার শুরু করা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। ছোট কাজের মাধ্যমে হলেও এগিয়ে চলা বড় কোনো অর্জনের ভিত্তি তৈরি করে।

এই পদ্ধতি অনুসরণ করতে চাইলে বড় কোনো ঘোষণা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং আগামীকাল থেকে এমন একটি ছোট কাজ শুরু করা যেতে পারে, যেখানে ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ খুব কম। হতে পারে মাত্র পাঁচ মিনিট হাঁটা, একটি পৃষ্ঠা পড়া কিংবা ডায়েরিতে কয়েকটি শব্দ লেখা। এসব ক্ষুদ্র অভ্যাসই ধীরে ধীরে বড় পরিবর্তনের জন্ম দেয়।

পাহাড়ের চূড়ায় এক লাফে পৌঁছানো যায় না। সেখানে পৌঁছাতে হয় এক ধাপ, এক পদক্ষেপ করে। কাইজেন দর্শনও ঠিক সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়। প্রতিদিন সামান্য অগ্রগতি ধরে রাখতে পারলে একসময় পেছনে তাকিয়ে দেখা যাবে, দীর্ঘ পথ অতিক্রম করা হয়ে গেছে অজান্তেই। জীবন বদলে দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হয়তো বড় কোনো সিদ্ধান্ত নয়, বরং প্রতিদিনের ছোট কিন্তু অবিচল পদক্ষেপ।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed