কানের মঞ্চে কারা জিতলেন সেরা সম্মান

বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আসর কান চলচ্চিত্র উৎসবের ৭৯তম আয়োজন শেষ হয়েছে পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে। গত শনিবার রাতে সমাপনী অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের নাম প্রকাশ করা হলে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয় বিভিন্ন বিভাগে পুরস্কার পাওয়া সিনেমা ও নির্মাতারা। এবারের উৎসবের সর্বোচ্চ সম্মান স্বর্ণপাম জিতে নিয়েছে রোমানিয়ান নির্মাতা মুঙ্গিউর চলচ্চিত্র ‘ফিওর’।

উদারনৈতিক সমাজের ভেতরের দ্বন্দ্ব, সামাজিক ভণ্ডামি এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার জটিলতা তুলে ধরা হয়েছে ‘ফিওর’ ছবিতে। এক প্রবাসী রোমানিয়ান পরিবারকে ঘিরে এগিয়েছে এর কাহিনি। ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী পরিবারটি নরওয়ের একটি ছোট গ্রামে নতুন জীবন শুরু করলেও সময়ের সঙ্গে স্থানীয় সমাজ ও প্রশাসনের সঙ্গে তাদের দূরত্ব তৈরি হয়। পরে শিশু নির্যাতনের অভিযোগ ওঠার পর তাদের সন্তানদের রাষ্ট্রীয় হেফাজতে নেওয়া হলে পুরো পরিবার ভয়াবহ সংকটে পড়ে। বাস্তব ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত ১৪৬ মিনিটের এই ছবিতে অভিনয় করেছেন সেবাস্তিয়ান স্ট্যান ও রেনাতে রেইনসভে।

পুরস্কার গ্রহণের সময় নির্মাতা বলেন, এটি সহনশীলতা, অন্তর্ভুক্তি ও সহমর্মিতার গল্প। তাঁর মতে, মানুষ এসব মূল্যবোধকে ভালোবাসলেও বাস্তব জীবনে সেগুলোর আরও বিস্তৃত প্রয়োগ প্রয়োজন। এর আগে ২০০৭ সালে তিনি ‘৪ মান্থস, ৩ উইকস অ্যান্ড ২ ডেজ’ ছবির মাধ্যমে স্বর্ণপাম জিতেছিলেন। ফলে এবার দ্বিতীয়বারের মতো এই সম্মান অর্জন করলেন তিনি।

উৎসবের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মান গ্রাঁ প্রি পেয়েছে ‘মিনোটর’। ফরাসি প্রযোজনার এই ছবির নির্মাতা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, দুর্নীতি, নৈতিক সংকট ও পারিবারিক ভাঙনের মতো বিষয় নিয়ে কাজ করে আসছেন। ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর সময়কে ঘিরে নির্মিত ছবিটিতে সফল ব্যবসায়ী গ্লেবের জীবন ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ার গল্প তুলে ধরা হয়েছে। যুদ্ধের প্রভাব কীভাবে মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, ভয় এবং আত্মরক্ষার প্রবৃত্তিকে আরও তীব্র করে তোলে, সেটিই ছবির মূল বিষয়।

পুরস্কার গ্রহণকালে নির্মাতা যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বলেন, সীমান্তের দুই পাশের লাখো মানুষ রক্তপাতের অবসান চায়। উল্লেখ্য, তাঁর ‘লাভলেস’ চলচ্চিত্র ২০১৭ সালে কানে জুরি পুরস্কার পেয়েছিল এবং অস্কারেও মনোনয়ন লাভ করেছিল।

এবার সেরা পরিচালকের সম্মান ভাগাভাগি করে নিয়েছেন স্পেনের নির্মাতা জুটি অ্যামব্রোসি ও কালভো এবং পোল্যান্ডের পাভলিকোভস্কি। স্প্যানিশ নির্মাতা জুটি তাঁদের ‘দ্য ব্ল্যাক বল’ ছবির জন্য এই স্বীকৃতি পান। ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত ছবিটি ইতোমধ্যেই সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। ব্যক্তিগত গল্পকে রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মিশিয়ে উপস্থাপন করাই তাঁদের নির্মাণশৈলীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

অন্যদিকে পাভলিকোভস্কি বহুদিন ধরেই ইউরোপীয় সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ নাম। তাঁর চলচ্চিত্রে সংলাপের চেয়ে নীরবতার উপস্থিতি বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ‘ইডা’ ছবির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক পরিচিতি পাওয়া এই নির্মাতা এবারও নিজের সৃজনশীলতার স্বীকৃতি পেলেন।

সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার যৌথভাবে পেয়েছেন জাপানের ওকামোতো এবং বেলজিয়ামের এফিরা। ‘অল অব আ সাডেন’ ছবিতে তাঁদের অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের মুগ্ধ করেছে। বৃদ্ধাশ্রমকে কেন্দ্র করে নির্মিত আবেগঘন এই সিনেমায় দুজনের অভিনয় ছিল বিশেষভাবে প্রশংসিত।

ওকামোতো মডেলিং থেকে অভিনয়ে এসে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। অন্যদিকে এফিরা দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় চলচ্চিত্রের শক্তিশালী অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিত। টেলিভিশন উপস্থাপনা দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করলেও পরে অভিনয়েই তিনি বেশি সাফল্য পান।

সেরা অভিনেতার পুরস্কারও যৌথভাবে অর্জন করেছেন বেলজিয়ামের মাকিয়া এবং ফ্রান্সের কম্পানি। ‘কাওয়ার্ড’ ছবিতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে দুই তরুণের মানসিক সংগ্রাম ও মানবিক সম্পর্কের গল্প ফুটে উঠেছে। নতুন প্রজন্মের এই দুই অভিনেতার অভিনয় বিশেষভাবে নজর কেড়েছে।

এদিকে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য দেওয়া মর্যাদাপূর্ণ ক্যামেরা দ’র পুরস্কার পেয়েছেন রুয়ান্ডার দুসাবেজাম্বো। তাঁর চলচ্চিত্র ‘বেন’ইমানা’ গণহত্যার পটভূমিতে নির্মিত হলেও এতে শুধু সহিংসতা নয়, মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম এবং নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্নও তুলে ধরা হয়েছে। পুরস্কার গ্রহণের সময় তিনি এই সম্মান নিজের দেশের নারীদের উৎসর্গ করেন।

সব মিলিয়ে এবারের কান উৎসব শুধু পুরস্কার ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। যুদ্ধ, মানবতা, সামাজিক সংকট, পরিচয় ও সম্পর্কের মতো সমসাময়িক নানা বিষয় উঠে এসেছে বিজয়ী চলচ্চিত্রগুলোর গল্পে। ফলে ৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসব চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে বৈচিত্র্যময় গল্প ও শক্তিশালী নির্মাণশৈলীর জন্য।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed