৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের সর্বোচ্চ সম্মান স্বর্ণপাম জিতেছে রোমানিয়ান নির্মাতা মুঙ্গিউর নতুন চলচ্চিত্র ‘ফিওড’। উদারনৈতিক সমাজের ভেতরের দ্বন্দ্ব, সহনশীলতার সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক ভণ্ডামিকে সামনে এনে নির্মিত এই সিনেমাটি শুরু থেকেই উৎসবজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। শনিবার বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত ১টা ৪০ মিনিটে সমাপনী আয়োজনে বিজয়ী হিসেবে ছবিটির নাম ঘোষণা করা হয়।
কান উৎসবে মুঙ্গিউ নতুন কোনো নাম নন। এর আগে ২০০৭ সালে তাঁর ‘৪ মান্থস, ৩ উইকস অ্যান্ড ২ ডে’ স্বর্ণপাম জিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনায় আসে। পরে ‘বিয়ন্ড দ্য হিলস’ তাঁকে এনে দেয় সেরা চিত্রনাট্যের স্বীকৃতি এবং ‘গ্র্যাজুয়েশন’ ছবির জন্য পান সেরা পরিচালকের পুরস্কার। এবার দ্বিতীয়বারের মতো স্বর্ণপাম ঘরে তুললেন এই নির্মাতা।
‘ফিওড’-এর গল্প আবর্তিত হয়েছে একটি রোমানিয়ান পরিবারকে ঘিরে। ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী পরিবারটি নতুন জীবনের আশায় নরওয়ের একটি ছোট্ট গ্রামে বসবাস শুরু করে। শুরুতে চারপাশের পরিবেশ স্বাভাবিক মনে হলেও ধীরে ধীরে স্থানীয় সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সঙ্গে তাদের দূরত্ব বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে পরিবারটির বিরুদ্ধে শিশু নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে এবং রাষ্ট্রীয় হেফাজতে নিয়ে যাওয়া হয় সন্তানদের।
অভিযোগের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও পুরো পরিস্থিতি পরিবারটিকে ভয়াবহ মানসিক সংকটের মধ্যে ঠেলে দেয়। সিনেমার বিভিন্ন দৃশ্যে সন্তানদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করার মুহূর্ত দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে তোলে। প্রদর্শনীর সময় অনেক দর্শককে বিস্ময়, ক্ষোভ ও আবেগে প্রতিক্রিয়া জানাতে দেখা গেছে। ছবিতে অভিনয় করেছেন স্ট্যান ও রেইনসভে।
পুরস্কার গ্রহণের সময় নির্মাতা বলেন, এটি সহনশীলতা, অন্তর্ভুক্তি ও সহমর্মিতার গল্প। তাঁর ভাষায়, মানুষ এসব মূল্যবোধকে ভালোবাসলেও বাস্তব জীবনে তার প্রয়োগ আরও বেশি প্রয়োজন।
বাস্তব ঘটনার অনুপ্রেরণায় নির্মিত ১৪৬ মিনিটের এই চলচ্চিত্রটি বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে নরওয়েজিয়ান সমাজের তথাকথিত প্রগতিশীল ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কারণে। একই সঙ্গে ছবিটি রক্ষণশীল ধর্মীয় বিশ্বাসের মানুষদের প্রতিও সহানুভূতিশীল অবস্থান নিয়েছে, যা ইউরোপীয় শিল্পধারার সিনেমায় তুলনামূলক কম দেখা যায়।
এবার উৎসবের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মান গ্রাঁ প্রি জিতেছে রুশ নির্মাতা জভিয়াগিনতসেভের ‘মিনোটর’। ইউক্রেন যুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত এই পারিবারিক নাটকে এক নির্মম ব্যবসায়ীর জীবন তুলে ধরা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই পুতিনের রাশিয়ার অন্ধকার বাস্তবতা নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য পরিচিত এই পরিচালক বর্তমানে ফ্রান্সে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। পুরস্কার গ্রহণের সময় তিনি ইউক্রেন যুদ্ধে রক্তপাত বন্ধের আহ্বান জানান।
অভিনয় বিভাগেও ছিল চমক। হামাগুচির ‘অল অব আ সাডেন’ ছবিতে অভিনয় করে যৌথভাবে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতেছেন ওকামোতো ও এফিরা। অন্যদিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত ‘কাওয়ার্ড’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য যৌথভাবে সেরা অভিনেতা নির্বাচিত হয়েছেন মাক্কিয়া ও কাম্পানি।
এ ছাড়া জুরি পুরস্কার পেয়েছে গ্রিসবাখের ‘দ্য ড্রিমড অ্যাডভেঞ্চার’। ‘দ্য ব্ল্যাক বল’ ছবির জন্য যৌথভাবে সেরা পরিচালকের স্বীকৃতি পেয়েছেন আমব্রোসি ও কালভো। স্পেনের কবি ও নাট্যকার গার্সিয়া লোরকাকে ঘিরে নির্মিত এই ছবিটিও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। একই বিভাগে ‘ফাদারল্যান্ড’-এর জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন পাভলিকোভস্কি।
রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্মিত আহাঙ্গারানির তথ্যচিত্র ‘রিহার্সালস ফর আ রেভোল্যুশন’ পেয়েছে সেরা প্রামাণ্যচিত্রের পুরস্কার। আর রুয়ান্ডার গণহত্যাভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘বেন ইমানা’র জন্য ক্যামেরা দ’অর জিতেছেন নির্মাতা দুসাবেজাম্বো। পুরস্কারটি তিনি উৎসর্গ করেছেন নিজ দেশের নারীদের।
বিশ্বের অন্যতম বড় চলচ্চিত্র উৎসব হিসেবে পরিচিত কান শুধু সিনেমা নয়, ফ্যাশন ও তারকাদের উপস্থিতির কারণেও আলোচনায় থাকে। এবারের আসরে ট্রাভোল্টা, ব্ল্যানচেট ও ডিজেলের মতো তারকারা উপস্থিত থাকলেও বড় হলিউড স্টুডিওগুলোর অনুপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ইউনিভার্সাল, ডিজনি বা ওয়ার্নারের মতো প্রতিষ্ঠান এবার কোনো বড় বাজেটের ছবি নিয়ে উৎসবে অংশ নেয়নি। ফলে ইউরোপীয় উৎসব থেকে হলিউডের দূরত্ব বাড়ছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
উৎসবজুড়ে আরও দুটি বিষয় ছিল ব্যাপক আলোচনায়। একটি হলো চলচ্চিত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, অন্যটি নারী নির্মাতাদের সীমিত উপস্থিতি। মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে থাকা ২২টি ছবির মধ্যে মাত্র পাঁচটি পরিচালনা করেছেন নারী নির্মাতারা।
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অভিনেত্রী ডেভিস বলেন, ১৯৯১ সালে তাঁরা ভেবেছিলেন, একটি জনপ্রিয় চলচ্চিত্র নারীদের জন্য নতুন যুগের সূচনা করবে। কিন্তু এত বছর পরও পরিবর্তনের গতি খুব ধীর বলেই মনে হচ্ছে।
গত ১২ মে শুরু হওয়া এবারের কান উৎসবের প্রধান জুরি ছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার খ্যাতিমান নির্মাতা পাক চান-উক। পুরো আয়োজনজুড়ে বিশ্ব সিনেমার নতুন ধারা, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও মানবিক সংকট উঠে এসেছে বিভিন্ন নির্মাতার কাজে। তবে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আলো কেড়ে নিয়েছে সহমর্মিতা ও মানবিকতার গল্প বলা ‘ফিওড’।





Add comment