ঈদুল আজহা কিংবা বছরের অন্য সময়, মাংস আমাদের খাদ্যতালিকার অন্যতম জনপ্রিয় উপাদান। গরু, খাসি, মুরগি বা অন্যান্য মাংস দিয়ে তৈরি নানা পদ বাঙালির রসনায় বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। শুধু স্বাদের জন্যই নয়, মাংস উচ্চমাত্রার প্রোটিন, আয়রন ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানের উৎস হিসেবেও পরিচিত। তবে এই উপকারী খাবারই বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে, যদি তা সঠিকভাবে সেদ্ধ না করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধা সেদ্ধ বা কাঁচা মাংস শরীরে বিভিন্ন ক্ষতিকর জীবাণু প্রবেশের সুযোগ তৈরি করে। এর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে নানা ধরনের ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও পরজীবী। এসব জীবাণুর কারণে খাদ্যে বিষক্রিয়া বা ফুড পয়জনিংয়ের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। সাধারণত এ ধরনের সংক্রমণে পেটব্যথা, ডায়রিয়া, বমি, বমি বমি ভাব কিংবা জ্বরের মতো উপসর্গ দেখা যায়। কিছু ক্ষেত্রে মলের সঙ্গে রক্তও যেতে পারে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে পানিশূন্যতা ও শরীরের লবণের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
শুধু তা–ই নয়, প্রাণী পালনের সময় অনিয়ন্ত্রিতভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হলে আরও জটিল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভুল নিয়মে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের ফলে প্রাণীর শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু থেকে যেতে পারে। সেই মাংস যদি যথাযথভাবে রান্না না করা হয়, তাহলে জীবাণুগুলো মানুষের শরীরেও প্রবেশ করতে পারে। এতে ভবিষ্যতে সংক্রমণ হলে প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ কার্যকর নাও হতে পারে। ফলে চিকিৎসা জটিল হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে।
এ ছাড়া আধা সেদ্ধ মাংসের মাধ্যমে বিভিন্ন পরজীবীও শরীরে প্রবেশ করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যার কারণ হতে পারে। এসব পরজীবীর কারণে অপুষ্টি দেখা দিতে পারে, অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে এবং লিভার বা ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। কিছু ক্ষেত্রে টক্সোপ্লাজমা নামের পরজীবীর সংক্রমণ গর্ভবতী নারীদের জন্য ভয়াবহ হতে পারে। এর ফলে গর্ভপাত কিংবা জন্মগত ত্রুটিসহ শিশুর নানা জটিলতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে মাংস সঠিকভাবে রান্না করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাংস পুরোপুরি সেদ্ধ হয়েছে কি না, তা বোঝার জন্য কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। সাধারণত মাংস ভালোভাবে সেদ্ধ হলে এর লালচে বা গোলাপি রং আর থাকে না। মাংসে চাপ দিলে যে রস বের হয়, সেটিও লালচে না হয়ে স্বচ্ছ বা হালকা বাদামি রঙের হয়। অনেক সময় বাইরের অংশ সেদ্ধ মনে হলেও ভেতরের অংশ কাঁচা থেকে যেতে পারে। তাই বিশেষ করে হাড়ের কাছাকাছি অংশ পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে যে সেখানে কোনো লালচে ভাব নেই।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেদ্ধ মাংস সাধারণত পিচ্ছিল থাকে না এবং এর আঁশগুলো স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। রান্নার সময় মাংস ছোট ছোট টুকরা করে কাটা হলে তা সহজে ও সমানভাবে সেদ্ধ হয়। একই পদের জন্য কাছাকাছি আকারের টুকরা ব্যবহার করাও জরুরি। কারণ, কোনো টুকরা বড় আর কোনোটি ছোট হলে ছোট অংশ দ্রুত গলে যেতে পারে, অথচ বড় অংশ ভেতরে কাঁচা থেকে যেতে পারে।
স্বাস্থ্যবিধি মেনে মাংস ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কাঁচা মাংস খালি হাতে না ধরাই ভালো। প্রয়োজনে পরিষ্কার গ্লাভস ব্যবহার করা যেতে পারে। খালি হাতে ধরলে অবশ্যই আগে ও পরে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুতে হবে। একই সঙ্গে কাঁচা মাংস কাটার জন্য ব্যবহৃত বঁটি, চাকু, চপিং বোর্ড বা অন্যান্য সরঞ্জাম অন্য কাজে ব্যবহারের আগে ভালোভাবে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে। কাঁচা মাংস এমনভাবে রাখতে হবে যেন এর রস অন্য খাবারের সংস্পর্শে না আসে। ডিপ ফ্রিজে সংরক্ষিত মাংস জমাট অবস্থায় সরাসরি রান্না করলে তা ভালোভাবে সেদ্ধ হয় না। তাই আগে সাধারণ ফ্রিজে রেখে গলিয়ে নেওয়া ভালো। প্রয়োজনে স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানিতে বা মাইক্রোওয়েভের ডিফ্রস্ট অপশনের সাহায্যে গলানো যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও পরামর্শ দিয়েছেন, কাবাব, গ্রিল বা বারবিকিউ করার আগে মাংস কিছুটা সেদ্ধ করে নেওয়া ভালো। এতে মূল রান্নার সময় ভেতর পর্যন্ত সঠিকভাবে তাপ পৌঁছায়। আগুনের আঁচও খুব বেশি না দিয়ে মাঝারি আঁচে ধীরে ধীরে রান্না করা উচিত। কারণ, অতিরিক্ত আঁচে বাইরের অংশ পুড়ে গেলেও ভেতর কাঁচা থেকে যেতে পারে।
খাবারের স্বাদ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নিরাপদ খাদ্যাভ্যাসও সমান জরুরি। সামান্য অসতর্কতার কারণে সুস্বাদু খাবারই বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই মাংস রান্না ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।





Add comment