অভিবাসন মামলায় ভেঙে গেল অভিযোগ

যুক্তরাষ্ট্রে বহুল আলোচিত অভিবাসন ও মানব পাচারসংক্রান্ত এক মামলায় বড় ধরনের মোড় এসেছে। এল সালভাদরের নাগরিক কিলমার আব্রেগো গার্সিয়ার বিরুদ্ধে আনা ফৌজদারি অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছেন টেনেসির একটি ফেডারেল আদালত। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সরকারের তদন্তপ্রক্রিয়া ছিল ‘ত্রুটিপূর্ণ’ এবং এই মামলার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের প্রভাব ছিল বলেও ইঙ্গিত মিলেছে।

ফেডারেল বিচারক তাঁর রায়ে বলেন, এল সালভাদরে বহিষ্কারের বিরুদ্ধে গার্সিয়ার করা মামলায় তিনি সফল না হলে যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে এই মামলা চালু করত না। আদালতের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটির তদন্ত পুরোনো হলেও সেটিকে পুনরায় সামনে আনা হয়েছে প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে বৈধতা দেওয়ার উদ্দেশ্যে।

এই মামলার সূত্রপাত ২০২২ সালের একটি ট্রাফিক থামানো ঘটনাকে ঘিরে। টেনেসিতে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর অভিযোগে গার্সিয়াকে থামায় স্থানীয় হাইওয়ে পুলিশ। তখন গাড়িতে আরও নয়জন যাত্রী ছিলেন। পুলিশ সদস্যদের মধ্যে মানব পাচার নিয়ে সন্দেহের আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে শুধু সতর্কবার্তা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। ওই সময় কোনো ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করা হয়নি।

পরে গত বছর গার্সিয়াকে এল সালভাদরে ফেরত পাঠানো হলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। বহিষ্কারের বিরুদ্ধে আদালতে লড়াইয়ের পর যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনকে তাঁকে ফেরত আনার নির্দেশ দেয়। দেশে ফেরার পরপরই তাঁর বিরুদ্ধে মানব পাচারের অভিযোগ আনা হয়। তবে তিনি শুরু থেকেই নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আসছিলেন।

বিচারক তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেন, সরকার যেসব তথ্যকে ‘নতুন প্রমাণ’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে, সেগুলো আইনের দৃষ্টিতে নতুন কিছু নয়। বরং আগেই তদন্তে থাকা তথ্য পুনরায় ব্যবহার করা হয়েছে। আদালতের মতে, প্রশাসন প্রকৃত মানব পাচারের তদন্তের বদলে গার্সিয়াকে অভিযুক্ত করার দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছে।

রায়ে আরও বলা হয়, তদন্তের উদ্দেশ্য ছিল নির্বাহী বিভাগের বহিষ্কার সিদ্ধান্তকে সমর্থন দেওয়া। বিচারকের ভাষায়, প্রশাসনের কর্মকাণ্ডে ‘প্রতিশোধমূলক মনোভাবের অনুমান’ স্পষ্ট হয়েছে এবং সেই অনুমান খণ্ডন করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।

গার্সিয়ার আইনজীবী আদালতের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, তাঁর মক্কেল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থার শিকার হয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, একসময় স্বাধীন হিসেবে পরিচিত বিচার বিভাগ এখন রাজনৈতিক চাপের মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে বলেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ আদালতের সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছে। এক মুখপাত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, আদালত জননিরাপত্তার চেয়ে রাজনীতিকে প্রাধান্য দিয়েছে। প্রশাসনের দাবি, এই সিদ্ধান্ত ভুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। তারা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কথাও জানিয়েছে।

গার্সিয়ার বিরুদ্ধে এল সালভাদরে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে আগেও আইনি জটিলতা ছিল। ২০১৯ সালের একটি আদালতের আদেশ অনুযায়ী, তাঁকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো যাবে না। কারণ, এক অভিবাসন বিচারক তখন মত দিয়েছিলেন যে, এল সালভাদরে তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়া একটি গ্যাংয়ের কারণে তিনি সেখানে নিরাপদ নন।

বর্তমানে ৩০ বছর বয়সী গার্সিয়া কৈশোরে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন। পরে তিনি এক মার্কিন নাগরিককে বিয়ে করেন এবং তাঁদের একটি সন্তানও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি মেরিল্যান্ডে বসবাস ও কাজ করছিলেন। একই সঙ্গে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের তত্ত্বাবধানেও ছিলেন।

মামলাটি পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত সাবেক ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি এর আগে বলেছিলেন, অভিযোগ গঠনের সিদ্ধান্ত তাঁর ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে, তা তিনি জানতেন। তবু তিনি বিশ্বাস করতেন যে অভিযুক্ত অপরাধ করেছেন এবং আদালতে তা প্রমাণ করা সম্ভব হবে।

এদিকে বিরোধী ডেমোক্র্যাট রাজনীতিকেরা শুরু থেকেই এই মামলাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ বলে উল্লেখ করে আসছিলেন। তাঁদের একজন বলেছেন, আদালতের সিদ্ধান্ত প্রমাণ করেছে যে পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল ক্ষমতার অপব্যবহার। তাঁর মতে, এ ধরনের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করবে।

এই মামলার রায় এমন এক সময়ে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসননীতি ও বহিষ্কার কার্যক্রম নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে রয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কঠোর অভিবাসন নীতি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। আদালতের এই সিদ্ধান্ত সেই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিল বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed